#ছোটগল্প
আজ আমার বিচার বসবে, বাসায় অনেক মানুষ এসেছে সেই উপলক্ষ্যে। তাই আমার দম ফেলার সময়টুকুও নেই। এতক্ষণে বুয়াকে সাথে নিয়ে পোলাও, রোস্ট, রেজালা আর শাহী সবজি রান্না শেষ, এবার খিচুড়ি বসাবো। আমার হাতের খিচুড়ি গরুর মাংস এবাড়ির অনেকের খুব প্রিয়। আপনারা বোধ হয় বুঝতে পারছেন না কিসের ভেতর কি, পান্তাভাতে ঘিয়ের গল্প কেন করছি। আমি নিজেই বুঝতে পারছি না কী বলছি আসলে। এমন বিচারের দিন জীবনে আগে তো আসে নাই। কেমন যেন ম্যাট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট দেবার মত একটা অনুভুতি!
বিচার বসবে কারণ আমি বেআদব, ননাস আর শাশুড়ির মুখে মুখে তর্ক করেছি। বিচার বসাবেন আমার দুই ভাসুর, দুই ননাস, এক ননদ, দুই মামা শ্বশুর শাশুড়ি আর এক খালা শাশুড়ি। আসলে আছেন আরো দুই খালা শাশুড়ি কিন্তু তারা আমাকে বেশ পছন্দ করেন তাই তাদের ডাকাই হয় নি। আমার দেবর এই বিচারের কথা শুনেই কালকে থেকে রাগ করে বন্ধুর বাসায় চলে গেছে। চেয়েছে আমাকে বাবার বাসায় দিয়ে আসতে। আমি যাইনি তাই আমার সাথেও রাগ করেছে।
আমি অর্পিতা। এই বাড়ির তিন নাম্বার বউ। বাকি দুই বউ আলাদা থাকে, ছুটির দিনে বেড়াতে আসে। আমি শ্বশুরবাড়িতে থাকি। এমনি আমি সাতে পাঁচে থাকি না। অফিস করি, রান্না করি। বিয়ের চার বছর হচ্ছে, বাচ্চা নেইনি এখনও। আজ মনে হচ্ছে ভালোই হলো তাতে। মায়ের বিচার সভায় নাহলে সে শিশুও এক বিচারক হত।
ঘটনার সূত্রপাত খুব সামান্য কারণে। এই শনিবার আমার এক বান্ধবীর বিয়ে।অনেক আগেই ঠিক করে রাখা যে আমি বুধবার চলে যাবো ওদের বাসায় নারায়ণগঞ্জে আর একবারে রবিবার অফিস করে আসবো। আমার হাসব্যান্ড আপন জানে, ওর কোনো সমস্যা নেই কিন্তু মায়ের অনুমতি নিতে বললো। আমার শাশুড়িকে বলতেই তিনি কিছু বলার আগে এক কথায় না করে দিলেন আমার মেঝ ননাশ, যিনি প্রায় সারা বছর ছেলে মেয়ে নিয়ে বাবার বাসায় থাকেন। সাথে এক গাদা কথা শুনালেন যেমন, ভদ্র ঘরের বউরা এভাবে মানুষের বাসায় গিয়ে থাকে না, বেশি লাই পেয়ে পেয়ে আমার এই অবস্থা, চাকরি করতে দেওয়া হয় এই অনেক। আমি বেশ অনেকক্ষন চুপ ছিলাম। যেই বললেন যে, এই জন্যেই ভাঙ্গা ঘরের মেয়ে আনতে হয় না - আমি রুখে উঠলাম।আমার বাবা মারা যাবার পর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে, আমি সেই ঘরেই মায়ের আরো দুই সন্তানের সাথে বড় হই আদরে শাসনে স্বাভাবিক নিয়মে কিন্তু এই খোঁটা আমার খাওয়াই লাগে যে আমি ভাঙ্গা ঘরের মেয়ে। আজও বুঝি না এ কথার মানে কি।
আমিও ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে বলে ফেলি, আপা আপনি তো ভরা ঘরেরই মেয়ে তাই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে ছড়ি ঘুরান? ব্যস্ তুলকালাম লেগে গেল। মজার ব্যাপার হলো যেই শনিবার রাতে রুম্পার বিয়ে সেই শনিবারে দুপুরেই আমার নামে দরবার বসলো। একেকবার মনে হচ্ছে, ধুর বিয়েতে তো এমনিও গেলাম না মাঝে দিয়ে কিসের মধ্যে পরলাম! আল্লাহ জানে কতগুলো কথা শুনাবে।
দুপুরে ভরপেট খেলো সবাই, আমার স্বামী ছাড়া। মুখচোরা মানুষ, গত দুই তিনদিন সে আমার থেকে একটু লুকিয়ে বেড়াচ্ছে, অশান্তির ভয়েই খেতে পারেনি মনে হয় । আমি বেশ স্বাভাবিক ভাবেই খেলাম। খাওয়ার পর সবাই লিভিং রুমে বসলো, তাও ভালো আমাকে সামান্য সম্মান দিয়ে বাচ্চাদের বাগানে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। গলা খাকারি দিয়ে আমার নন্দাই বিচারের অধিবেশন শুরু করতেই যিনি ঢুকলেন ঘরে তাকে দেখে আমি কল দেওয়া পুতুলের মত দাঁড়িয়ে গেলাম। বাপি - আমার সৎ বাবা, আমার মায়ের দ্বিতীয় স্বামী। তাকেই বিবাদী পক্ষ হিসেবে ডেকে আনা হয়েছে। মা মারা যাবার পর উনার সাথে আমার গত দুই বছর দেখা হয় নাই। উনি ফোন করেন মাঝে মাঝে, আমি তাও না। আমার আপন বাবা মারা যাবার সময় আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি, আরেকজনকে বাবার আসন দেওয়ার জন্যে বয়সটা খুব একটা উপযুক্ত না! কাজেই মা আর বাপির অনেক চেষ্টার পরেও আমি কখনোই বাপির সাথে সহজ হতে পারি নি। এটা সবাই জানে, আর আমাকে "টাইট" দেওয়ার জন্যে বাপিকে ডাকা এটাও ভালোই বুঝতে পারি। আমি আমার স্বামীর দিকে তাকাতেই সে চোখ ঘুরিয়ে ফেললো, তারমানে সেও জেনে বুঝে আমার গোপন ক্ষতে আঘাত দেয়াতে সায় দিয়েছে!
শুরু হলো অভিযোগের বহর। আমি দেরীতে উঠি, আমি বাসায় গেঞ্জি প্যান্ট পরি, স্বামীকে নাম ধরে ডাকি, মুড দেখাই, কাজে ফাঁকি দিতে মাইগ্রেন এর অজুহাত করি, পায়ে ধরে সালাম করি না থেকে শুরু হয়ে নন্দাইকে দেখে মুখ গোমড়া করে রাখা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বেআদবি পর্যন্ত যে যা পারে বললো। আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল। শুধু এ জন্যে না যে চার বছর ধরে চেনা মানুষগুলোর মনে আমার বিরুদ্ধে এতো বিষ, বরং আরো বেশি এ জন্যে যে বাপির সামনে এসব বলা হলো, বাপি শুনলো - যাকে কোনোদিন আমি রিপোর্ট কার্ডে সাইন করতে যেন কোনো উনিশ বিশ না দেখেন, কখনো কোনো অভিযোগ শুনতে না হয় আমার জন্যে তাই আমি দিন রাত এক করে পড়ালেখা করতাম, শান্ত মেয়ে হয়ে থাকতাম।
অভিযোগ শেষে আমার শাস্তি হলো আমার মেঝ ননাশের কাছে আমার মাফ চাইতে হবে এবং সবার সামনে আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ আর দ্বিতীয়বার ঘটবে না অঙ্গীকার করতে হবে। নইলে আমার ননাশের সাথে আমি এক বাড়িতে থাকতে পারবো না অর্থাৎ আমাকে বের করে দেওয়া হবে।
আমি অঙ্গীকার করতেই দাঁড়ালাম। আমার উপায়ই বা কী। চোখের পানিতে সবাইকে ঝাপসা দেখতে দেখতেই হঠাৎ অনুভব করলাম একটা হাত আমাকে শক্ত করে ধরে ফেললো। বাপি!!!
বাপি এতক্ষণ একটা কথাও বলে নাই। এমনিও উনি কম কথাই বলেন। এবার বাপি।বললেন, " আপনারা আমার মেয়েটার বিরুদ্ধে এত্ত অভিযোগ দিলেন। মেয়েটা আমার সেই কবে থেকে আমার কাছে ছিল, আমি তো কই একটা দোষ ধরতে পারলাম না তার। নিজের বাবা ছিলাম না, দোষ দেখলে চোখে পরতই। তাও তো দেখলাম না। আজ আমাকে যখন আপনারা ফোন দিলেন আমি জিজ্ঞাসা করলাম আমার মেয়ে কই, তখনও বললেন যে ও রান্না করছে। অথচ এতো জমায়েত ওর বিচার বসাতেই। উঠতে বসতে আমার মেয়েটাকে এতো কিছু বললেন তার মানে এতদিন এখানে ও খুব সুখে ঘর করেছে
আমার এ ধারণা ঠিক না। আপনাদের পারিবারিক ব্যাপার কে থাকবে আর কে যাবে, তবে যে বাড়িতে এতো সামান্য ব্যাপার যেটা মীমাংসা করা যেত, সে জন্যে এভাবে অপদস্থ করা হয়েছে অর্পিতাকে। এ বাড়িতে আমি আমার মেয়ে থাকতে দিবো না।
ঘরে যেন বাজ পড়লো একসাথে অনেকগুলো, অথচ বাবা কথা বলেছেন একদম নিচু গলায়। আমার স্বামী এতক্ষণ চুপ ছিল, এখন মনে হয় তার মনে হয়েছে তারও কিছু বলার আছে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো, " ইয়ে, আঙ্কেল মানে বাপি, আপনি যে বলছেন আপনি ওকে নিয়ে যাবেন, ওকে কিন্তু তেমন কিছুই বলা হয় নাই ক্ষমা চাইতে বলা ছাড়া। আপা ওর মুরুব্বী, ক্ষমা চাইলে কী ই বা হবে। নিয়ে গেলে কিন্তু এবাড়ির দরজা ওর জন্যে বন্ধ হয়ে যাবে। এমন ভাববেন না যে আমি ওকে আনতে যাবো।"
আমি অবাক হয়ে তাকালাম তার দিকে। এ বলে কী? পেটে পেটে তো তারও জিলাপি কম না!
হঠাৎ বাপি মেঘ গর্জন করে উঠলো," তোমার মেরুদন্ডের জোর আমার দেখা হয়েছে বাবা, তোমার আর আমাকে ভয় দেখানোর দরকার নাই। যে নিজের বউয়ের সম্মান নিলামে তোলে, এমন ছেলের কাছে আমার মেয়ে দিয়েছি ভাবতেই আমার নিজেকে থাপড়াতে ইচ্ছে করছে।"
অপমানিত আপন এবার আমার কাছে এসে কেটেকেটে বললো," আমার ঘর করতে চাইলে তোমার সৎ বাবাকে আমাদের বাসা থেকে চলে যেতে বল"।
পুরো বিকালে প্রথম আমি চোখ মুছে ওর দিকে সোজা তাকালাম। আমি ওর থেকে বড় চাকরি করি, বেশি বেতন পাই, দেখতে সুন্দরী বলে ওর অনেক কমপ্লেক্স জানতাম। কিন্তু আমাদের সম্পর্কের এই ঠুনকো অবস্থা আমার জানা ছিলো না। বলি," উনাকে ডেকে এনেছ তোমরা আমার অভিভাবক হিসেবে, আমাকে বলার প্রয়োজন মনে করো নি। এখন যখন উল্টো স্রোতে নৌকো যাচ্ছে অমনি বাপি সৎ বাবা?" শাশুড়ি তখন আমাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে বললেন," বেয়াই সাহেব, মাফ চাইলেই কিন্তু ল্যাঠা চুকে যেত, আপনি খামাখা জিনিসটাকে ঘোরালো করলেন। কতদিন মেয়েকে ঘরে পালবেন। ফেরত তো পাঠাবেন মাঝে দিয়ে জলঘোলা হবে।" বাপি একটু হাসলেন, বললেন," মেয়ে যাবে বাবার বাসায় বাপ ভাইকে নিয়ে থাকবে আপা। পালার প্রয়োজন ওকে হবে না, উল্টো ও ই ছোট থেকে ওর ভাইদের পেলেছে। দোআ করবেন যেন ফেরত পাঠানোর মত দুর্দিন না আসে"।
আমি আর দাঁড়ালাম না। যৎসামান্য কাপড় আর প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে বেরিয়ে গেলাম বজ্রাহত একদল মানুষের সামনে দিয়ে।
গাড়িতে উঠে আমি আর বাপি চুপ করে বসে রইলাম। আমি আসলে বুঝতেই পারছিলাম না হচ্ছে কি আমার জীবনে! বাপির সাথে আমি কোনোদিন সহজ ছিলাম না, বাপিও হাল ছেড়ে দিয়েছিল। আলোকবর্ষ দূরে থাকা সেই বাপির ভরসায় আজ সংসার ছেড়ে এলাম! অনেকক্ষন চুপ থাকার পর বাপি ড্রাইভার আনিসকে গাড়ি ঘুরিয়ে উনি চানখাঁরপুলের দিকে নিতে বললেন। আমি তাকাতেই একটু হেসে বললেন," সাড়ে সাতটা বাজে, এখনও নারায়ণগঞ্জ গিয়ে তোমার বান্ধবীর বিয়ে ধরতে পারবে।" কিছুক্ষন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে আমি আমার জমানো অবরুদ্ধ সব কষ্ট একসাথে নিয়ে বাপি বলে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পরলাম, আর সেই মানুষটা শক্ত হাতের বন্ধনে আমাকে এমনভাবে বাঁধলেন যে এক লহমায় আমি কৈশোরে চিরতরে হারিয়ে ফেলা বাবাকে যেন নতুন করে ফিরে পেলাম।
সংগৃহীত
Shahadat Hossain
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
Sujon Kumar Roy
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
Mohammed Nur Nobi
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
KR Ronnie
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
Golam Rabbani
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
mijan joy
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
zunaid ahmed
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
Monihari
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
ফাতেমা আক্তার
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?