করোনা সমাচারঃ
দু'টা বড় বড় ব্যাগ নিয়ে মুখে মাস্ক লাগিয়ে সাইফুল সাহেব চললেন বাজারের উদ্দেশ্যে। সাতদিন পর এই প্রথম বাইরে বের হলেন। বড় রাস্তায় উঠেই একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলেন। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কোন অটোরিকশা নেই, অন্য কোন বড় যানবাহন নেই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে দুই একজন লোক হনহন করে হেঁটে যাচ্ছেন। নিশ্চয় তাঁর মতই কোন না কোন জরুরী প্রয়োজনে তারা বের হয়েছেন। দূরের মোড়ের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন একটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। আজকে আর রিকশা-টিকশা নয়, আজ তাঁকে হাঁটতে হবে। দু'টো পুলিশের গাড়ি দু'দিক থেকে ছুটে তাঁর কাছাকাছি এসে একে অপরকে ক্রস করে বিপরীতদিকে আবার ছুটে চলে গেল। বিলম্ব না করে সাইফুল সাহেব নাহার রোডের দিকে পা বাড়ালেন।
বড় রাস্তা ধরে খানিকটা হেঁটে এসে বাম দিকে টার্ন নিতেই সাইফুল সাহেব নাহার রোড পেয়ে গেলেন। প্রবেশমুখে একটা লম্বা বাঁশ আড়াআড়িভাবে রাখা। বুঝলেন করোনা সংক্রমণ ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা; গণহারে যাতে লোকজন এই গলি দিয়ে চলাচল করতে না পারে। বাঁশটা পাশকাটিয়ে তিনি গলির ভিতর ঢুকে পড়লেন। তারপর আবার পা চালাতে শুরু করলেন। গলির রাস্তাটা একেবারেই ফাঁকা। অথচ কত মানুষজনের আনাগোনাই না থাকে এই গলিতে। বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদের। দলে দলে প্রাইভেট পড়তে আর কোচিং করতে আসা কচি কচি ছেলেমেয়েদের কলকাকলিতে সকাল-সন্ধ্যা মুখরিত থাকে পুরো গলি। অথচ এখন সমগ্র গলিজুড়ে সুনসান নিরবতা। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন, দু'ধারের বড় বড় দালানের বেলকনি থেকে অনেকেই তাঁর এই একা একা শূন্য পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া দেখছেন। কেমন একটা অস্বস্তিতে পেয়ে বসে তাঁকে।
সাংকিপাড়া বাজারে পৌঁছে সমস্ত বাজারটার উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন সাইফুল সাহেব। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে লোকজনের উপস্থিতি অনেক কম। তারপরও যা আছে তাতেই প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রেখে বাজার করা যাবে কি-না তিনি সন্দিহান হয়ে পড়লেন। যাহোক, মোটেই বেশী দেরি করা যাবে না। ঝটপট প্ল্যান করে ফেললেন তিনি। প্রথমে ক'টা মুরগী কিনবেন, তারপর শাকসবজি। যেই ভাবা সেই কাজ। রেললাইনের উপর দিয়ে অন্যদের সাথে গা ছোঁয়াছুঁয়ি বাছিয়ে তিনি সাবধানে সামনের দিকে পা বাড়ালেন।। মুরগীর বাজার পড়তেই মনসুরের দোকান চোখে পড়লো। দু'জন খরিদ্দার তার দোকানের সামনে দাড়িয়ে কেনাকাটা করছে। তাঁকে দেখা মাত্রই হাত ইশারা করে মনসুর ডাকাডাকি শুরু করে দিল। অন্যদিন হলে এই ডাক তিনি উপেক্ষা করতে পারতেন না, কিন্তু আজ অন্য খরিদ্দার দেখে পাল্টা ইশারায় তাকে 'না' বলে দিলেন। আর একটু এগিয়ে মন্টুর মা'র দোকানের কাছাকাছি হতেই মন্টুর মা একগাল হাসি দিয়ে তাঁকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো, "ভাইজান আইসেন, ভালো মুরগী আছে, দামও কম। বেচাকেনা নেই, ব্যাবসাও নেই। এই আপনের মাত্র একশ নব্বই টাকা সোনালী।" মন্টুর মা জানে, সাইফুল সাহেবের প্রথম পছন্দ সোনালী মুরগী। তাই ভালো সোনালী থাকলেই পীড়াপীড়ি করেন।
চারটি সোনালী মুরগীর অর্ডার দিয়ে রেললাইন ধরে সামনের দিকে আবার হাঁটতে শুরু করলেন। মুরগী জবাই করে প্রোসেস করতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে, সুতরাং এই সময়টার সদ্ব্যাবহার করে একটু হেঁটে আসা যাবে। আসার সময় যতটুকু পথ হেঁটেছেন তা যথেষ্ট মনে হয়নি তাঁর নিকট। তাছাড়া ফিরে যাবার সময় তো বাজার ভর্তি ব্যাগ থাকবে হাতে, হাঁটার সুযোগ থাকবে না, রিকশা নিতেই হবে। যা করার এখনই করে নিতে হবে। আবার বাইরে বের হবার সুযোগ কবে আসবে কে জানে!
বাজার পার হয়ে রেলক্রসিং, তারপর আরও একটু এগিয়ে যেতেই শহরতলী। রেললাইনের দু'পাশ দিয়ে বেশখানিকটা করে জায়গা সবুজ ঘাসাচ্ছাদিত হয়ে ফাঁকা পড়ে আছে, এবং তারই উপর দিয়ে পায়ে চলা পথ রেললাইন বরাবর দূরে কোথাও চলে গেছে। সাইফুল সাহেব রেললাইন থেকে নেমে বামপাশের পথ বেয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। এক বৃদ্ধ সামনে দিয়ে একটি দুধেল গরুর দড়ি ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছেন। গরুটা সামনে চলতে বড়ই অনিচ্ছুক। হয়তো আরও একটু ঘাস খেতে চায়, কিন্তু তার মালিক তাকে সে-সুযোগ দিচ্ছে না। হঠাৎ আগেপিছে না ভেবে বৃদ্ধ লোকটি তাঁর গরুটাকে তাগাদা দিতে হাতের নড়িটা উঁচু করতেই গরুটা ভয় পেয়ে পিছনের দিকে দে ছুট। সাইফুল সাহেবকে পাশ কাটানোর সুযোগ পেল না গরুটি। তাঁকে ধাক্কা দিয়ে এক পাশে ছিটকে দিল। ওদিকে তালসামলাতে না পেরে বৃদ্ধলোকটি তাঁর গায়ের উপর হুড়মুড় করে পড়ে গেলেন। তারপর দু'জন মিলে একাকার হয়ে কয়েকটা গড়া খেলেন। গড়াগড়ি শেষ হতেই সাইফুল সাহেব কোনক্রমে খাড়া হয়ে দাঁড়ালেন। মুখের মাস্কটা খুলে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল তা উঠিয়ে নিলেন। হাত-পা কোন কিছু ভেঙ্গেছে কি-না ভালো করে পরোখ করলেন। না, করুনাময়ের কৃপায় তেমন কিছু হয়নি। লোকটি তখনও মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছেন। তাঁর দুর্দশা দেখে সাইফুল সাহেব তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার স্পৃহা হারিয়ে ফেললেন। বরং মায়ার বশবর্তী হয়ে হাত বাড়িয়ে তাঁকে উঠালেন। লোকটি উঠে দাড়িয়েই শুধালেন, "বাবু, চোট পাইছন নাতো?" তাঁর এই সৌজন্যতায় বিগলিত হয়ে সাইফুল সাহেব তাঁকে সকল অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়ে দিলেন। অভয় দিয়ে মুখে বললেন, "না না, কোন সমস্যা নেই। ও আপনি কোন চিন্তা করবেন না।" মনে মনে বললেন, এখন করোনা থেকে রক্ষা পেলেই রক্ষা।
-সংগৃহীত।
Raihan Ali
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
Niloy Chowdhury
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
Md Zayid
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
Md Arif Islam
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
Aronno Mondal
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?
Monihari
Kommentar löschen
Diesen Kommentar wirklich löschen ?