আজ নিয়ে তিনদিন হলো রোজ সকালবেলা পাশের বাড়ির খালাম্মার সাথে আমার দেখা হয়ে যাচ্ছে। আমি উনার কাছ থেকে নিজেকে আড়ালে রাখার শত চেষ্টা করছি কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না। উনার সাথে সকালবেলা দেখা হওয়া মানে হচ্ছে, দিনটা আমার ষোল আনাই বৃথা যাওয়া। কোন এক অদ্ভুত কারণে উনার সাথে যেদিন আমার দেখা হয় সেদিন বাবার সাথেও উনার দেখা হয়ে যায়।
খালাম্মাদের বাড়ি আমাদের বাড়ির সাথে লাগোয়া। উনাদের বাড়ি থেকে জোর গলায় কথা বললে আমাদের বাড়ি থেকে সব স্পষ্ট শোনা যায়। প্রায়শই খালাম্মার চিৎকার, চেঁচামেচি, কান্নাকাটি শোনা যায়। খালাম্মাদের বাড়ির সামনে দিয়ে একটা লিংক গলি অন্যপাশের রাস্তায় চলে গেছে। সেই গলিতেই আমি মাঝে মাঝে বাবার ভয়ে বিপদগ্রস্ত হয়ে লুকিয়ে থাকি। আমি যখন গলিতে গিয়ে লুকাই ঠিক তখনই খালাম্মার বাইরে বের হবার সময় হয়। এতো করে চাই তিনি আমাকে না দেখুক তারপরও কিভাবে যেন দেখে ফেলেন। যেদিন গলিতে দেখা হয়না সেদিন অন্য কোন রাস্তায় দেখা হয়ে যায়। মোট কথা বিপদের সময় তিনি আমাকে দেখবেন-ই দেখবেন। প্রথমে আমার সাথে তার দেখা হবে এরপর দেখা হবে বাবার সাথে।
আমাকে দেখলে রোজিনা খালাম্মা যেন নতুন একটা কাজ পেয়ে যান—আমাকে প্রশ্ন করা। একের পর এক প্রশ্ন তিনি আমাকে করতেই থাকেন। প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমি হাঁপিয়ে গেলেও উনার প্রশ্নপর্ব শেষ হয় না। জীবনে এতো প্রশ্ন কোন স্যারও আমাকে একদিনে করেননি।
আজ সহ তিনদিন থেকে বাবার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। এখন রাত সাড়ে আটটা। বাবা বাড়ি ফিরেছেন। বাড়ি ফিরেই মাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, "তোমার চাঁদ ছেলেটা কোথায়? কতদিন এইভাবে লুকিয়ে থাকবে?"
বাবার অফিস থেকে বাসায় ফেরার খবর জানার সাথেই আমি আমার ঘরের বিছানার নিচে অবস্থান নিয়েছি। গত দুদিনও ঘরের সব বাতি নেভার আগ পর্যন্ত বিছানার নিচে কাটিয়েছি। মশা গুলো ভীষণ যন্ত্রণা দিচ্ছে। আমার এই বিপদের দিনে আমাকে জ্বালিয়ে এরা খুবই মজা পাচ্ছে। ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তে বাবার ঘর থেকে মশা মারার র্যাকেট টা নিয়ে এসে সবগুলোকে ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে মারি কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে বাবার ঘরে গেলেই ধরা খেয়ে যাবো, যা কোনভাবেই কাম্য নয়। শুধু যে মশারাই বিরক্ত করছে ব্যাপারটা এমন না, মানুষ বিপদে পড়লে সবকিছুই খুব মজা নেয়। কিছু তেলাপোকা আমার গায়ে উঠে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। বিছানার নিচে অবস্থান না নিলে জানতেই পারতাম না বাসায় ইঁদুরের উপদ্রব এতো বেড়ে গেছে।
বছরে কয়েকবার এমন বিপদ আসে, বাবার কাছ থেকে লুকিয়ে থাকতে হয়। এবারের বিপদের কারণ হচ্ছে পরীক্ষার ফলাফল। সম্প্রতি আমার পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, ফলাফল খুবই জঘন্য হয়েছে, রিটেক দেওয়া ছাড়া গতি নেই। পড়ি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে, রিটেক দেওয়া মানে বাবার কতগুলো টাকা গচ্ছা দেওয়া, সেজন্যই তিনি ফলাফল জানবার পর থেকে আমাকে সুযোগ মতন খুঁজে বেড়াচ্ছেন। পেলে নিশ্চয়ই কপালে শনি আছে। এই বয়সে গায়ে নিশ্চয়ই হাত তুলবেন না কিন্তু মুখ তো আর থেমে থাকবে না, বাড়ি থেকে বের করে দিলে কোন মহাসমুদ্রে গিয়ে পড়ব তার কোন কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছি না।
বলা হয় বিপদের দিনে বন্ধুরাই ভরসা—এই কথার যে কোনই ভিত্তি নেই তার বাস্তব প্রমাণ পেয়েছি। ভেবেছিলাম বাড়ির পরিবেশ শান্ত হবার আগ পর্যন্ত কোন বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে থাকবো কিন্তু বন্ধুরা একেকজন একেকরকম সমস্যার কথা বলে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের বাসায় থাকা যাবে না। বাধ্য হয়ে নিজেদের বাড়িতেই থাকতে হচ্ছে। বাবা অফিসে যাবার আগে গোসল করে যান। তিনি গোসল করতে ঢুকলেই আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাই। বাসায় ফিরি বাবা অফিসে চলে যাবার পর। সারাদিন খুব আনন্দেই কাটে, সমস্যাটা হয় বাবা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর। দীর্ঘ সময় বিছানার নিচে লুকিয়ে থেকে মশা, তেলাপোকা, ইঁদুরের যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়।
রাত দশটা বেজে গেছে, বড়ই বিপদের মধ্যে আছি। মশাদের প্যানপ্যানানি, তেলাপোকাদের সুড়সুড়ি, হঠাৎ হঠাৎ ইঁদুরের আগমন খুবই পীড়া দিচ্ছে কিন্তু বাইরে বের হবারও উপায় নেই, বাবা আমার ঘরে বসে আছেন। আজ সম্ভবত তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, আমাকে দেখেই তারপর ছাড়বেন অথবা বাড়ি থেকে বের করে দিবেন। সমূহ বিপদের মধ্যে সবথেকে বড় বিপদ হচ্ছে রোজিনা খালাম্মা। আজসহ তিনদিন আশ্চর্যজনক ভাবে তার সাথে আমার দেখা হয়ে গেছে। আগেও যতবার বিপদে পড়েছি খালাম্মার সাথে আমার দেখা হয়েছে তবে এইবারের দেখা হবার ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক। তিনদিনই দেখা হয়েছে তিনি তার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে কলেজে যাবার সময়, বোধ করি তিনি ভেবেছেন আমি তার মেয়ের জন্য রাস্তায় রাস্তায় অপেক্ষা করে থাকি কিন্তু এইরকম হবার কোনই সম্ভাবনা নেই, রোজিনা খালাম্মার একমাত্র মেয়ে বিউটি কিছুদিন আগে এক ছেলের সাথে পলায়ন করেছিল, তাকে সম্প্রতি ধরে নিয়ে আসা হয়েছে সুতরাং তার জন্য অপেক্ষা করে থাকার কোন প্রশ্নই ওঠে না।
বাবা আমার চেয়ারে বসে আছে, হঠাৎ মা এসে ঘরে ঢুকলো। সম্ভবত বাবার জন্য চা নিয়ে এসেছে। বাবা বললেন, "তোমার ছেলে কোথায় লুকিয়েছে? তিনদিন থেকে তো একবারও আমার সাথে দেখা হলো না কিন্তু পাশের বাড়ির মেয়ের সাথে তো ঠিকই দেখা হচ্ছে।"
মা বলল, "মানে? পাশের বাড়ির কোন মেয়ের কথা বলছো? বিউটি?"
--"বিউটি না টিউটি জানি না, কিন্তু তাকে দেখবার জন্য তো তোমার ছেলে ডিউটি বেশ ভাল দিচ্ছে।"
--"বাজে কথা বলবে না একদম। এই মেয়ে, মেয়ের মাকে আমাদের নীড় একদম দেখতে পায় না।"
--"ও আচ্ছা এইজন্যেই বুঝি রোজ তার কলেজে যাবার সময় রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে রয়? পরীক্ষায় শুধু শুধু তো আর ডাব্বা মারে না। ডাব্বা মারার উপর্যুক্ত কারণ আছে। তোমার ছেলে ঐ ঝগড়াটে মহিলার মেয়ের পিছন পিছন ঘুর ঘুর করে।"
--"একদম ফালতু কথা বলবে না বলে দিলাম।"
--"খুব লাগছে নাকি? ছেলেকে লায় দিয়ে দিয়ে নষ্ট বানাচ্ছো তুমি, বুঝবে সময় হলে সব বুঝবে।"
বেশকিছুক্ষণের জন্য বাবা মা দুজনই নিরব হয়ে রইলেন। হঠাৎ রোজিনা খালাম্মার চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা গেল। তিনি রফিক আংকেলকে (তার স্বামীকে) কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলছেন, "তোর সংসার আমি আর করবো না।"
রফিক আংকেল বললেন, "যা যা, তুই গেলেই বাঁচি। মা-মেয়ে দুইটাই হইছে একরকম, সমাজে মুখ দেখাতে পারি না।"
কাঁচের জিনিসপত্র ভাঙ্গার শব্দ শোনা গেল। মা বাবাকে বলল, "ঐ যে তোমার বান্ধবী চেঁচাতে শুরু করেছে, যাও গিয়ে বান্ধবীকে থামিয়ে এসো।"
বাবা রেগে গিয়ে বললেন, "একদম লিমিট ক্রস করবে না বলে দিলাম। ঐ মহিলা কোন কালে আমার বান্ধবী ছিল?"
--"ছিলো না? তাহলে এতো গায়ে পড়ে ঝগড়া করা শিখলে কোথায়?"
--"আমি ঝগড়া করি? তাও আবার গায়ে পড়ে? এইজন্যে মহিলাদেরকে দেখতে পাই না। তোমরা সব এক।"
--"তোমরা পুরুষরা যে কত্ত ভাল!"
--"কি করেছি?"
--"কি করো নি? অনর্থক সবসময় চেঁচামেচি করো। তোমার জন্য ছেলেটা ভয়ে ভয়ে শেষ। নিজের ছেলেকে এই পর্যন্ত কতবার বাসা থেকে বের করেছো?"
--"বাসা থেকে বের করেছি বেশ করেছি, ঘুরে ফিরে তো বাড়িতেই ফিরে এসেছে নাকি? তোমার বন্ধু রফিক মিয়ার মেয়ের মতো আরেকজনের হাত ধরে পালিয়ে তো যায়নি।"
--"পালিয়েছেটা কার সাথে? কোন পুরুষ মানুষের সাথেই তো নাকি? তোমরা পুরুষরা নারীদেরকে বাধ্য করো। তোমরা সব পুরুষ মানুষই খারাপ।"
আমি বিছানার নিচ থেকে বের হবার মোক্ষম একটা সুযোগ পেলাম। দ্রুত বিছানার বাইরে এসে হাত-পা ঝাড়তে ঝাড়তে মাকে বললাম, "না মা কথা টা তুমি ঠিক বলো নি। একটা মেয়ে বাসা থেকে পালানোর সময় বাবা-মা'র কথা ভাববে না? শুধুমাত্র নিজের স্বার্থের জন্য আরেক ছেলের সাথে পালিয়ে যাবে? যারা তাকে জন্ম দিলো, পেলে বড় করলো তাদের কথা ভাববে না?"
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "দেখ না তোর মা কি শুরু করেছে। সব পুরুষ মানুষই নাকি খারাপ?"
--"এটা তুমি ভুল বলেছো মা।"
মা আমার দিকে রক্তচোখে তাকিয়ে বলল, "খুব বাপের কথায় সমর্থন দিচ্ছিস। বলেছি না সব পুরুষ খারাপ, এই তার প্রমাণ।"
বাবা বললেন, "এখানে প্রমাণের কি দেখলে? নীড় তো ঠিকই বলেছে।"
মা বলল, "এতোদিন যে বাপের ভয়ে পালিয়ে বেড়ালি, তোর খোঁজ খবর কে রেখেছে? খেতে দিয়েছে কে? বেঈমান, তোরা সব পুরুষরা বেঈমান।"
মা রেগে-মেগে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। আমি বাবার সাথে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে খাবার টেবিলে গেলাম। বাবা মাকে ডেকে বললেন, "টেবিলে খাবার দাও নীরা।"
মা ভেতরের ঘর থেকে বলল, "আমার কি ঠেকা পড়েছে? নিয়ে এসে খাও। কাল থেকে রান্না-বান্না সব বন্ধ, নিজেরা রান্না করে খাবে।"
বাবা হতাশ চোখে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, "তুই বোস, আমি আসছি।"
কিছুক্ষণ পর বাবা-মা দুজন খাবার নিয়ে এসে চেয়ার টেনে বসলো। মা খাবার বেড়ে দিতে দিতে আমাকে বলল, "এরপরের বার যদি রেজাল্ট খারাপ করিস না, তাহলে তোর বাবা না, আমিই তোকে বাসা থেকে বের করে দেবো।"
মা'র মুখ থেকে এমন কিছু শুনবো আশা করিনি। মুহুর্তের মধ্যে বাবা কি এমন করলেন যে মা তাঁর সমর্থক বনে গেল? ঘুষ দিয়েছে নাকি? দিয়ে থাকলে খুব খারাপ করেছে কারণ, "ঘুষ দেওয়া নেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।"
#collected
MD.AYIUB ALI
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Md Roman
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Mdjohir
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Sajjadur Rahaman
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Apurbo Ahsan
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Mansur Alam Badhon
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Mohammed Nur Nobi
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?