#খালু শ্বশুরের বাসায় দাওয়াত

ভদ্রলোক আড়চোখে আমাকেই দেখছেন বুঝতে পারছি। উনার চেহারায় বিষাদের ছাপ স্পষ্ট। হয়তো তিনি এমনভাবে কাউকে কখনো খেতে দেখেননি অথবা নিজে ডায়াবেটিস এর রুগী হওয়ার কারণে খেতে পারছেন না দেখেই এমন চাহনি। এই মুহূর্তে আমার এতোকিছু খেয়াল না করলেও চলবে। সবেমাত্র তিন পিছ রোস্ট খেয়েছি। বেল্টের হুক অতি সন্তর্পণে খুলে দিয়েছি।

খালু শ্বশুরের বাসায় দাওয়াত খেতে এসে ইতোমধ্যে দুই হাজার চারশত পঞ্চাশ টাকা খরচ হয়ে গেছে। সেই মূল্যবান টাকা উসুল না করে আমি কোথাও যাচ্ছিনা। দিনের বেলার দাওয়াত হলেও সেটাকে রাত অব্দি ঠেলেঠুলে নিতে পারলেই পয়সা উসুল। ভেবেছিলাম এক হাজার টাকায় মামলা খতম করবো, কিন্তু কিসের কি! রিমি নামক ওই মহিলার কারণে আমার জীবনের মানে বদলে যাচ্ছে।

সকালে খুশি মনে মিষ্টি কিনে নিয়ে আসলাম বাসায়। দুই কেজি মিষ্টি, চারশো পঞ্চাশ টাকা। মোটামুটি সস্তা দেখে মন ফুরফুরা ছিলো। দোকানের নাম দেখেই রিমি তেলে-বেগুনে জ্বলে গেছে। উনি নাকি বলেছিলেন প্রিমিয়ার এর মিষ্টি আনতে। আমি নিয়ে এসেছি "প্রিয়ার মায়ের মিষ্টি"।

এলাকায় এ দোকানটা নতুন দিয়েছে। সেই নিয়েই এলাহি কান্ড। রিমি এটা কিছু হলো বলো! মিষ্টির দোকানের নাম এমন রেখেই তো বেটারা ভেজাল করেছে। প্রিয়ার মায়ের কোন নাম নেই, নাকি? মায়ের নাম থাকলেই আর ভেজাল হতোনা।

ধরো, পাশের ফ্ল্যাটের ভাবিকে যদি নেহার মা না বলে মল্লিকা বলি, তাতেই কি ভালো হয়না! কি সুন্দর নাম, মল্লিকা। শুনলেই তো কবিগুরুর মল্লিকা বনের কথা মনে পড়ে যায়। আহা!

রিমির তাকানোর লক্ষ্মণ ভালো ছিলোনা। তোমার তো ওই একটাই কাজ। ভাবিদের নিয়ে কোন বনে যাওয়া যায়, সারাক্ষণ তো মনের মাঝে সেটাই ঘুরপাক খায়। কোন ভাবির কি নাম তা একেবারে মুখস্থ করে বসে আছো। মল্লিকা বন তুমি দেখেছো কখনো, আসিফ?

ওয়াস্তাগফিরুল্লাহ। এইগুলা কি বলো রিমি! বন তো বন। ছোট বেলায় ঝোপঝাড়ের ভেতর কতো খেলেছি। ওরকম কিছু একটাই হবে হয়তো! একবার সামিয়ার সাথে ঝোপে পালিয়ে খেলছিলাম দেখে কি মাইরটাই না খেলাম। তখন ক্লাস থ্রি তে পড়ি আমি।

তুমি আসলেই একটা উজবুক। আর একটা কথাও বলবেনা। এই মিষ্টি আমি এখনই মাজেদা খালার বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। তুমি দেরি না করে প্রিমিয়ার এর মিষ্টি নিয়ে আসবে, যাও।

রিমি টুনটুনি, দুইদিন পর বাতেনের বাসায় দাওয়াত আছে। এই মিষ্টিগুলা না হয় রেখে দাও। যাওয়ার সময় ওর বাসায় নিয়ে যাবো। শালা আমার ভাগের মিষ্টি খেয়ে ফেলেছিলো সেদিন। নীলা কি যত্ন করে নিজ হাতে মিষ্টি বানিয়ে মেসে নিয়ে এসেছিলো। আমি তো নীলাকে দেখেই অবাক। এতো সুন্দর লাগছিলো ওকে। আবেগের বশে বলে ফেলেছিলাম, বাতেনরে ওই মিষ্টি আমার লাগবেনা। তুই খেয়ে ফেল। ওই মিষ্টি হাসি দেখেই পেট ভরে গেছে। দেখো কি বদমায়েশ সে! আমাকে না দিয়ে সত্যিই খেয়ে ফেলেছিলো।

আসিফ, এ কাহিনি তো আমাকে আগে বলোনি। নীলা, তোমার মেসে যেতো? তুমিতো বলছো, ওকে দেখলেই নাকি দোয়া পড়তে। এক হাত দূরত্ব ম্যান্টেইন করে চলতে। আজ বাসায় আসি, তোমার কাহিনি বের করবো আমি। অনেক হিসেব জমে গেছে।

ধুর! কপালটাই খারাপ। সব দোষ ওই চিকনা বাতেনের। ওর কথা বলতে গেলেই প্যাঁচ লাগে। মাজেদা খালা এর মধ্যেই উনার মেয়ের বাসায় ফোনে দাওয়াত দিয়ে দিয়েছে। মিষ্টি পেয়েই ব্যাপক খুশি উনি। ভাইজান ভালা মিষ্টি আনছেন তো? আপনি তো আবার জন্মের কুইষ্টা। বলেই সেই দন্ত কেলানো হাসি উপহার দিয়েছেন।

কি সাংঘাতিক কথা! দুই কেজি মিষ্টির দাম পড়েছে পনেরো শত পঞ্চাশ টাকা। আবার লেখা, টাকা অনলি!সব বাটপারি কাজ কারবার। আমার খুব ইচ্ছে ছিলো কোরবানির গরুর (অনেকে করে) মতো, প্যাকেটের গায়ে দামসহ সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়ার। আমি থাকবো সিএনজির ভেতর আর প্যাকেট থাকবে বাইরে। মানুষকে দেখাতে দেখাতে আনবো। কিন্তু রিমির আবার উবার ট্যাক্সি ছাড়া চলবেনা। কোন ইচ্ছেই আর পূরণ হয়না আমার!

সবাই টেবিল থেকে খেয়ে উঠে গেছে। কিন্তু আমি নড়ছিনা এতো সহজে। ভদ্রলোক মনে হয় বিশ্বাস করতে পারছেনা, এখনো কেউ খেয়ে যাচ্ছে। উনি শেষ মেষ মুখ খুললেন। প্রিয়ার মা, জামাইকে মাছ দাও। অনেক স্বাদের ইলিশ মাছ।

এখানেও প্রিয়ার মা। আমার শালিকার নাম প্রিয়া, মনেই ছিলোনা। খালু শ্বশুরের দোকান নাকি ওটা আবার! তলে তলে এতো কাহিনি তো বুঝতে পারিনি। আর এই রোস্ট ফেলে মাছ খাওয়ানোর জন্য এতো উদগ্রীব হয়ে আছেন কেন উনি?

রিমি কয়েকবার এইরুমে এসে হালকা কাশি দিয়ে গেছে। আমি যাতে উঠে যাই এই ইশারাই দিচ্ছে সে। আরে পকেটের টাকা খরচ করে মিষ্টি তো আমিই এনেছি। তোমার ভাইকে যখন দাওয়াত দিয়েছিলাম, দুই কেজি বোম্বাই জিলাপি নিয়ে যে এসেছিলো, ভুলে গেছি?

উনারে কি মিলাদের কথা বলছিলাম একবারো? তখন বলেছিলে, দেখেছো ভাইয়ার কি বুদ্ধি! মিষ্টি তো সবাই নিয়ে আসে। কিন্তু এমন রসালো জিলাপি শুধু আমার ভাইয়াই আনতে পারে। উনার বাসায় এরপর যাওয়ার সময় দুই কেজি মিষ্টির শিরা নিয়ে যাবো। তখন দেখবা রসের প্রকারভেদ। ওই শিরাকে পাঁচ ভাগ করে আলাদা আলাদা ব্যাগে নেবো। একটায় একটু লবণ, একটায় গোল মরিচ, একটায় আদা কুচি, একটায় কালি জিরাগুঁড়া এবং আরেকটায় বিট লবণ মেশাবো। দেখি এরপর কি শিক্ষা হয়!

খালু সাহেব চেয়ার থেকে উঠে গেছেন। উনার তলপেটে মনে হয় চাপ পড়েছে। ইজ্জত রক্ষা করার জন্য হলেও আর থাকতে পারেননি। খালা শ্বাশুড়ি মানে প্রিয়ার মা, ইলিশ মাছের টুকরো প্লেটে উঠিয়ে দিয়েছেন। আমি মানা করেছিলাম তবুও শোনেননি। উনাদের সবারই দেখি একই উদ্দেশ্য। আমাকে রোস্ট খেতে দেবেনা আর। সবেমাত্র ছয় নম্বরটা খাচ্ছিলাম।

খালা, আপনি কি কোন মিষ্টির দোকান দিয়েছেন আমাদের এলাকায়? আপনার নাম তো জানিনা খালা। কিন্তু ওভাবে মেয়ের নাম না দিয়ে নিজের নামও দিতে পারতেন। রিমি আর খালা হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এরকম প্রশ্ন করবো সেটা আশা করেনি একেবারেই। রিমি বুঝলেও খালা শ্বাশুড়ির চোখের পলক পড়ছেনা। বাবা, তোমার কি খাওয়া ভালো লাগেনি?

খালা আলহামদুলিল্লাহ। তবে পেটে জায়গা থাকলে আরেকটু খেতাম।

খাও বাবা, সময় নিয়ে খাও। মাত্রইতো বসছো।

উনি কি আমাকে খোঁচা দিলেন! ওমা, গলায় এটা কি আটকিয়েছে? কথা বলতে বলতে ইলিশের কাঁটা আটকে গেছে। আমি কয়েকটা রাম কাশি দিলাম, লাভ হচ্ছেনা। আল্লাহ গো, এরা বিরাট প্ল্যানিং করেই এগিয়েছে।

সবাই মোটামুটি ব্যস্ত হয়ে গেছে আমাকে নিয়ে। খালু শ্বশুর মনে হচ্ছে মিটি মিটি হাসছে। প্রিয়ার মা, জামাইকে দুইটা বড় বড় সাগর কলা খাওয়াও। দেখবা ঠিক হয়ে যাবে।

খালু এইগুলা কি বলছে? এই অবস্থায় দুইটা সাগর কলা খাওয়ার জায়গা থাকতে হবেতো!

রিমি আর খালা জোর করে ঠেসেঠুসে আমাকে কলা খাওয়াচ্ছেন। খালুজি হাসছেন। আর পারলাম না আমি। দৌড়ে ওয়াসরুমে গিয়ে সব উদগীরণ করে এসেছি। মাথা পুরাই ঘুরাচ্ছে। গলার কাঁটা মনে হয় বের হয়ে এসেছে এখন। কিন্তু আমার কি হবে! সব খাওয়া জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছি। আমার খাবারের আফসোস আর শেষ হচ্ছে না।

আমাকে এক গ্লাস লেবুর শরবত দেয়া হয়েছে। খালু শ্বশুর বিরাট চাল চেলেছেন। রিমি শোন, জামাইয়ের পেটে মনে হয় চাপ পড়েছে। বাসায় গিয়ে নরম ভাত আর করলা ভাজি খাওয়াবি। তাহলেই দেখবি ঠিক হয়ে গেছে।

আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। মন মেজাজ পুরাই খারাপ। কোন টাকাই উসুল হলোনা আমার। শোন আসিফ, তুমি আসলে মানুষ না জলহস্তী বুঝতে পারিনা আমি। একটা মানুষ এতো গলধঃকরণ কিভাবে করে? আবার সেটা ভেতরে রেখে দেয়ার মতো মুরোদ ও নেই। তোমাকে আজ মল্লিকা বনে বসিয়ে বসিয়ে করলার জুস খাওয়াবো আর নীলার সাথের কাহিনি বের করবো। তলে তলে তুমি অনেক কিছুই করেছো দেখছি।

আমি চোখেমুখে পোলাও রোস্ট ছাড়া কিছু দেখছিনা এখন। আমার করলা খাওয়া দেখে মাজেদা খালা খুব মজা পাচ্ছে। ভাইজান, আপনার লাইগ্যা বাসার থাইক্যা তেহারি আনছিলাম। খুব স্বাদ হইছে। করলার লগে একটু মিলাইয়া খান। খারাপ লাগতোনা।

করলার রসে ডুবিয়ে তেহারি খাচ্ছি। খুবই বিদঘুটে স্বাদ। এই খাবারটা খালু শ্বশুরকে খাওয়াতে পারলে বেশ হতো। রিমি সামনে বসে তেহারি আর কোক খাচ্ছে। আমি আনমনে মল্লিকা বন কি তাই ভেবে যাচ্ছি! এই মুহূর্তে ভাবি ছাড়া অন্য কিছুর কথা মনে পড়ছে না।

#collected

সহজ এফিলিয়েট

ঘরে বসে সহজ আয়

ফেসবুক চালাতে পারলেই আয় করতে পারবেন

এখনি শুরু করুন