বাসা থেকে বের হতেই জুঁইকে দেখলাম রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। কাকে যেন সে বাবু বলে ডাকছে। মা বলেছে এই মেয়ের ধারের কাছ দিয়েও যেন না যাই, এর সমস্যা আছে কিন্তু কি সমস্যা আছে তা আর বলেনি। আমি বহুদূর দিয়ে যাবার সময় শুনলাম সে বলছে, 'বাবু দাও না দাও না একটা।' আমি আশ্চর্য না হয়ে আর পারলাম না৷ এই মেয়ে আমাদের মহল্লাতেই থাকে, সে বিয়ে করল কবে? বাচ্চাও হয়ে গেছে! বাচ্চা ফোনে কথাও বলা শিখে গেল! আশ্চর্য হয়ে অফিসের পথে ছুটলাম।
বাসে বসে আছি। পাশের সিটে উন্মাদ প্রকৃতির এক যুবক বসে আছে। ফোনে ঘ্যানঘ্যান করতে করতে সে আমার কান দুটোকে অসহ্য বানিয়ে দিয়েছে। ইয়ারফোন না নিয়ে আসলে যা হয়। সামনে কন্টাকটারের সাথে বাসের প্যাসেঞ্জারের সাথে তুমুল ঝগড়া লেগেছে, গাড়ির হর্ণ, রিকশার শব্দ, বাজার, দোকান, ফুটপাতের হৈচৈ এর শব্দে কান একদম ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে।
প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘসময় ধরে ট্রাফিক সিগন্যালে বসে আছি। বাস ভর্তি গাদাগাদি করে লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ বিন্দু বিন্দু জল এসে গায়ে পড়ল, আমি তৎক্ষণাৎ ভেবেছিলাম, বাসের ছাদের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ছে কিন্তু বৃষ্টির ছিটেফোটাটিও নেই। কোত্থেকে জল পড়ল খুঁজতে খুঁজতে কেন্দ্রবিন্দু পেয়ে গেলাম, আমার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক ঘেমে একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুই করার নেই, এসব সয়েই প্রতিদিনকার জীবন, নিয়মিত চলাচল।
অফিসের সামনেই মানিকের চায়ের দোকান। অফিসে ঢোকার আগে মানিকের দোকানে হাজিরা দেওয়া রোজকার নিয়ম।
গাড়ি থেকে নেমে মানিকের দোকানে বসে চা-সিগারেট খেয়ে খোশমেজাজে অফিসে ঢুকে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসলাম। অফিসটা হচ্ছে শান্তির জায়গা, একটা ব্যাপার বাদে। এসির ঠাণ্ডা বাতাসে ঘুম চলে আসছে। চোখ বন্ধ করে সুখকর স্মৃতিচারণ করছিলাম এমন সময় পিয়ন এসে বলল, "স্যার আপনাকে স্যার একবার দেখা করতে বলেছে।"
এই একটা ব্যাপার। শুধুমাত্র এই ব্যাপারটার কারণেই অফিস শান্তির পর অশান্তির জায়গা।
স্যারের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছি। তিনি একদৃষ্টিতে কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে অত্যন্ত বিরক্তমুখে বললেন, "আজকেও জ্যাম ছিল?"
আমার সরল উত্তর, "জ্বী স্যার।"
স্যারের হাব-ভাব দেখে মনে হলো তিনি এখনই নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে এক বিশ্রী কাণ্ড করে বসবেন তেমন কিছু তিনি করলেন না। খুবই শান্ত ভাবে বললেন, "এক কথা আর কত? সময়মতো অফিসে আসতে না পারলে এবার চাকরিটা ছাড়ো। সবাইকে দিয়ে চাকরি হয় না বুঝলে?"
আমি চুপচাপ বসে রইলাম।
স্যার একটা ফাইল আমার সামনে রেখে বললেন, "যাও কাজটা করে নিয়ে আসো।"
আজ বড় ধরনের বাঁচা বেঁচে গেছি। পনেরো-বিশ মিনিট দেরি করে আসায় অফিসের কি কি সমস্যা হয়ে যাচ্ছে এসব শুনতে হয়নি।
স্যারের ঘর থেকে ডেস্কে ফিরে দেখলাম রুনা এসেছে। রুনা আমার কলিগ, দেখতে শুনতে বেশ ভাল, কি সুন্দর করে হেসে হেসে কথা বলে! ইচ্ছা করে কাজকর্ম সব বাদ দিয়ে সারাক্ষণ তার সাথে কথা বলি কিন্তু রূপবতী নারীদের কাছ থেকে দূরে থাকা ভাল, সেজন্য আর কথা বলা হয় না। মাঝে মাঝে হায়-হ্যালো ব্যাস এতোটুকুই।
অফিসে দেরি করে আসার অভ্যাসটা রুনার মধ্যেও আছে। আমার চেয়ে কোন অংশেই তা কম নয়। ব্যাপারটা বেশ রহস্যজনক মনে হয়। আমি দেরি করে অফিসে আসলেই স্যার ডেকে পাঠান। বেশিরভাগ দিনই ঝারি দেন কিন্তু রুনাকে কিছুই বলতে কখনো দেখলাম না। সে সর্বদা হাসিমুখে স্যারের ঘরে ঢোকেন হাসিমুখে বের হয়ে আসেন। এই হাসাহাসির রহস্যটা কী? দশটার অফিস কি তার জন্যে এগারোটায় শুরু হয়?
স্যারের দেওয়া কাজ সেড়ে ফাইল নিয়ে স্যারের ঘরে ঢুকলাম। স্যারের ঘরে রুনা বসে আছে। আমি অবশ্য দরজা নক করেই ঢুকেছি তবে ঢুকেই বুঝতে পারছি তাদের মধ্যে বেশ হাসাহাসি চলছিল। অফিসের নিয়মিত ঘটনা। পুরো অফিসে প্রচলিত আছে রুনার সাথে স্যারের প্রণয়ের সম্পর্কের কথা। এ নিয়ে রুনারও কোন অভিযোগ নেই।
আমি স্যারকে উদ্দেশ্য করে বললাম, "স্যার আমি কি পরে আসবো?"
স্যার বললেন, "না এসো।"
আমি গিয়ে রুনার পাশের চেয়ারে বসে স্যারের দিকে ফাইল এগিয়ে দিলাম।
স্যার ফাইল দেখতে দেখতে বললেন, "গুড, ফাইন, ওকে তুমি এখন যাও।"
আমি ডেস্কে ফিরে আসলাম।
গাড়িতে ঝুলে ঝুলে রাত নয়টায় বাড়ি ফিরলাম। ফ্রেশ হয়ে ডাইনিংয়ে গিয়ে বসলাম। মা খাবার বেড়ে দিল। খেতে খেতে বললাম, "মা জুঁইয়ের কি বিয়ে-শাদী কিছু হয়েছে?"
মা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, "কি হয়েছে?"
--"না কিছু না।"
--"হঠাৎ জুঁইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করলি?"
--"না মানে অফিসে যাবার সময় দেখলাম কাকে যেন বাবু বলে ডাকছে। তুমি আমাকে ছোট থাকতে যেভাবে বাবু বলে ডাকতে না? ঠিক ওমনি ভাবে। ওর বিয়ে হলো কবে বাচ্চাই বা হলো কবে আর বাচ্চা কথা শিখলো কবে? কিছুই তো জানলাম না।"
--"ধুর পাগল, বিয়ে কবে হলো? কি সব আবোল-তাবোল বলছিস? বিয়ে হলে আমরা জানবো না?"
--"এখনকার কত বিয়ে কাক-পক্ষীতেও জানে না বুঝলে?"
--"তুই বিয়েটা কবে করবিরে? বয়স তো আর আমাদের কম হলো না, আমাদের সঙ্গী দরকার, তোর বাবা প্রায়ই বলে।"
এই প্রশ্নের কোন উত্তর আমার জানা নেই। চুপচাপ বসে থাকতে দেখে মা ফের বলল, "কাউকে তোর পছন্দ আছে?"
পছন্দ যাদের ছিলো আমি চাকরি পাবার আগেই তাদের সব সংসার হয়ে গেল, এখন চাকরি আমার ঠিকই আছে কিন্তু পছন্দের কেউ নেই। চাকরির সাথে পছন্দ-অপছন্দ, বিয়ে-শাদীর যেন আঠার মতো সম্পর্ক। "কিরে কি ভাবিস?"
মায়ের কথায় সংবিত্ ফিরে পেয়ে বললাম, "নাহ পছন্দ নেই কাউকে।"
--"তাহলে আমরা মেয়ে দেখি?"
--"ইচ্ছা হলে দেখো।"
জীবনটা নিরামিষ হয়ে যাচ্ছে। রোজদিন সকালে গাড়িতে ঠেলাঠেলি করতে করতে অফিসে যাওয়া, সারাটাদিন কাটিয়ে রাতে উল্লুকের মতো বাসে ঝুলতে ঝুলতে বাড়ি ফেরা, জীবনে যেন এর বাইরে আর কিছু নেই। এই জীবনের ছন্দ পরিবর্তনের জন্য বিয়ে আবশ্যক হয়েছে কিন্তু বিয়ের পর আমার অবস্থাটা হবে কী? একথা ভেবে ভেবে মাথা খারাপ হচ্ছে।
ছুটিরদিন বিকেলবেলা জুঁইদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। জুঁই বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। আমাকে দেখতেই ফোন রেখে আমার দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "আপনি খালাম্মাকে কি বলছেন ভাইয়া?"
আমি থতমত খেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, "কই কিছু না তো।"
--"তাহলে খালাম্মা আম্মাকে এসব জিজ্ঞাসা করেছে কেন?"
--"কি জিজ্ঞাসা করেছে?"
--"আমার বিয়ে হয়েছে কিনা, বাচ্চা-কাচ্চা হয়েছে কিনা, এইসব।"
--"ও আচ্ছা, না মানে কিছুদিন আগে ফোনে তুমি কাকে যেন বাবু বাবু করে বলছিলে, বাবু তো বাচ্চাদেরকে ডাকে তাইনা? সেজন্য ভাবছিলাম বিয়ে-শাদী হলো কি না, বাবু হলো কবে, কিছুই তো জানলাম না।"
জুঁই হেসে ফেলে বলল, "বাবুকে দেখবেন ভাইয়া?"
আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে বললাম, "কই দেখি।"
জুঁই ফোনের গ্যালারি থেকে একটা ছবি বের করে দিল, ছবি দেখে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। ছবিতে আমার ভুড়িয়াল স্যারের পাশে জুঁই বসে আছে। স্যার জুঁইয়ের আত্মীয়-স্বজন কিছু একটা হতে পারে এমনটাই ভাবছিলাম, স্যারের স্ত্রীর খালাতো-মামাতো বোন সূত্র ধরে স্যারের শ্যালিকা হতে পারে। হতেই পারে কিন্তু জুঁই হঠাৎই বলল, "ওকে ভালবেসে, আদর করে বাবু বলে ডাকি ভাইয়া।"
মাথাটা খারাপ হবার উপক্রম হলো। বাড়ি ফিরে চুপচাপ নিজের ঘরে বসে আছি। মা এসে পাশে বসে বলল, "বাবা তোর ফারুক কাকা এক মেয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। মেয়ের ছবি দেখে আমার পছন্দ হয়েছে। তুই একটু দেখ।"
মাথাটা এখনো চক্রাকারে ঘুরছে। মাকে ছবি রেখে যেতে বললাম।
বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমে ঘুমে গোটা রাত কেটে সকাল হয়ে গেছে বলতে পারি না। ঘুম থেকে উঠে বালিশের পাশেই মা'র রেখে যাওয়া ছবির উল্টোপিঠ চোখে পড়ল। আমি কাগজ উল্টে ছবি দেখে রীতিমতো বিশাল এক ধাক্কা খেলাম, ছবিটা আমার অফিসের কলিগ রুনার।
সাড়াশব্দহীন বেশকিছুক্ষণ বসে রইলাম, শরীরটা নিশ্চল হয়ে আসছে। কোনক্রমে মুখ-হাত ধুয়ে ডাইনিংয়ে গিয়ে বসলাম। মা বলল, "ছবিটা দেখেছিস? চল আগামী শুক্রবার মেয়েটাকে দেখে আসি।"
মাথাটা পুনরায় চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করেছে। কি এক বিশ্রী ঝামেলার মধ্যে পড়লাম! শরীর ঘেমে যাচ্ছে। মা জিজ্ঞাসা করল, "কিরে কি হয়েছে? ঘেমে যাচ্ছিস কেন?"
আমি ঘামার কারণ অতিরিক্ত ঝালের উপর চাপিয়ে দিয়ে বললাম,
"ঝাল লেগেছে।"
--"সেকি তেমন তো ঝাল দেইনি।"
--"মরিচে কামড় লেগেছে।"
--"যাবি না?"
--"কোথায়?"
--"মেয়েটাকে দেখতে যাবি না?"
খাওয়া শেষ করে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মাকে বললাম, "তোমাদের সঙ্গী পেতে আরও দেরি হবে। আপাতত বিয়ে-শাদী করা যাবে না।"
#collected
Imran Joarder
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
12Shf
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Mansur Alam Badhon
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?