দশ টাকার অহংকার!
আমাদের দেশে এখনও দশ টাকায় এক কাপ চা, একটা সিঙ্গারা, একটা চপ এবং একটি সমুচা পাওয়া যায়। এ তো দেখি শায়েস্তা খানের আমল! অবাক হচ্ছেন নাকি শুনে? অবাক হবেন না। এটাই সত্যি। আমাদের প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের ক্যান্টিনে মাত্র দশ টাকায় এতগুলো খাবার পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক মো. আখতারুজ্জামান স্বয়ং এই তথ্য প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে কথা প্রসঙ্গে তিনি গর্বের সঙ্গে বলেছেন, এটি যদি বিশ্ববাসী অর্থাৎ কোনও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানতে পারে তাহলে এটা গিনেজ বুকে রেকর্ড হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে প্রিয় শিক্ষকের এই ভিডিও কথা ইতোমধ্যে বিশ্ববাসী জেনে গেছেন। তার ভিডিও কথায় অসংখ্য লাইক পড়েছে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন। একজন লিখেছেন, চা সিঙ্গারার মতো ক্ষুদ্র জিনিস নিয়ে গর্ব করার কি আছে আমি বুঝি না’। আমি অবশ্য এতটা নেতিবাচকভাবে বিষয়টাকে দেখতে চাই না। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ফুটপাতের দোকানেও যদি আপনি একটি চপ, একটি সিঙ্গারা, একটি সমুচার সঙ্গে এক কাপ চা খেতে চান তাহলে কমপক্ষে চল্লিশ টাকা খরচ করতে হবে। ‘৪০ টাকার মাল মাত্র ১০’ টাকায় দিচ্ছি এজন্য তো গর্ব করতেই পারি। আমার ধারণা শ্রদ্ধাভাজন ভিসি মহোদয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অভিভাবক হিসেবেই তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের সামনে কথাগুলো বলেছেন। মাঝে মাঝে বাবা-মা যেমন ছেলেমেয়েদের সামনে বলে থাকেন, ‘দেখো তোমাদের জন্য আমরা কি না করছি। যখন যা চেয়েছো তা-ই দিয়েছি। ভালো স্কুল, কলেজে ভর্তি করিয়েছি। এখন তোমাদের দায়িত্ব ভালো রেজাল্ট করে দেখানো...।’
এই ভালো রেজাল্ট প্রসঙ্গেই কথা তুললেন আমার এক আত্মীয়। তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তাদের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো। অহংকারের সঙ্গে তিনি বললেন, একটা তথ্য বোধকরি সবাই ভুলে গেছে যে, আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় বিশ্বের সেরা ৫০ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের তালিকায় উঠে এসেছিল। ভাবা যায়, আমাদের প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে কতটা এগিয়ে ছিল? যে বিশ্ববিদ্যালয়কে একদা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এখন বিশ্বের হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও নাকি খুঁজে পাওয়া যায় না। তাহলে ‘৪০ টাকার মাল মাত্র ১০ টাকায়’ খাইয়ে লাভ কী?
ভদ্রলোকের কথায় আমি মোটেই খুশি হতে পারিনি। খাওয়া নিয়ে খোটা দেওয়া মধ্যবিত্ত মানসিকতার লক্ষণ। ভদ্রলোক পরবর্তীতে যে কথাগুলো বলেছেন, তার সঙ্গে আমি একমত। একসময় কিনা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। শিক্ষা-দীক্ষার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলনসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে প্রাণপ্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই তো জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথাই যদি ধরি, এক্ষেত্রেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনেক। খেলাধুলায় তারকা তৈরি হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকাশ ঘটেছে মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই। আর আজ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথা না হয় বাদই দিলাম, খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রেও কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাফল্য দেখাতে পারছে?
অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, সময় পাল্টেছে। একসময় দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। আর এখন সারা দেশে শত শত বিশ্ববিদ্যালয়। কাজেই শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা সত্যি বেশ কষ্টসাধ্য। তাদের কথার সূত্র ধরেই বলি, বটগাছের সঙ্গে অন্য গাছের তুলনা হয় না। বটগাছের নিচে ছোটখাটো অনেক গাছের জন্ম হয়। কিন্তু বটগাছ বটগাছই থাকে। তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করা যাবে না। ঐতিহ্যে, আভিজাত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। তবে শিক্ষা আর শিষ্টাচার চর্চায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন ঠিক কোন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
আবারও অহংকারের সঙ্গে বলতে চাই, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য বিশেষভাবে গর্ব করার মতো। এমন একটা সময় ছিল বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা-নেত্রীদের একনজর দেখার জন্য ক্যাম্পাসে আসতো বাইরের লোকজন। প্রয়াত লেখক আকবর হোসেনের ‘ঢেউ জাগে’ নামে একটি আলোচিত উপন্যাস লেখা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর জীবনকে ঘিরে। ষাটের দশকে লেখা হয়েছিল এই উপন্যাস। উপন্যাসের একটি অধ্যায়ে ঝড়ের দিনের বর্ণনা পড়ে অবাক হয়েছি। দিনে প্রচণ্ড ঝড় হয়েছে। ক্যাম্পাসের নানা জায়গায় ঝড়ের তাণ্ডবে গাছ ভেঙে পড়েছে। কলাভবনে আটকে পড়েছে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা। তখনকার দিনে একজন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা নিজে উপস্থিত থেকে ঝড়ের কারণে বিপদগ্রস্ত হয়ে ওঠা ছাত্রছাত্রীকে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছেন। আজকের দিনে যা হয়তো কল্পনাই করা যাবে না। ছাত্রনেতা বৃষ্টিতে ভিজে সাধারণ ছাত্রছাত্রীকে বিপদ থেকে উদ্ধারে সহায়তা করবেন? তিনি তো গাড়ি ছাড়া চলেন না। বছর দুয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের ক্যাফেটেরিয়ায় আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রধান অতিথি উপস্থিত থাকবেন। টিএসসির সামনে প্রবেশমুখে দেখি একদল তরুণকে দুই সারিতে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। ঘটনা কী? কেন তারা এভাবে দাঁড়িয়ে আছে? হঠাৎ মনে হলো তারা বোধকরি ভাইস চ্যান্সেলরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে। পরক্ষণেই ভুল ভাঙলো একটি দৃশ্য দেখে। দুই লাইনে প্রায় ৫০/৬০ জন তরুণ দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ গাড়ি থেকে নামলেন একজন ছাত্রনেতা। তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার স্টাইলে অভ্যর্থনা জানালো এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা তরুণেরা এবং ছাত্রনেতার নামে স্লোগান দিতে দিতে টিএসসির ভেতরে ঢুকে গেলো। খোঁজ নিয়ে জানলাম যাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হলো তিনি একটি ছাত্রসংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি।
দৃশ্যটি দেখে সেদিন মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছিল। একজন ছাত্রনেতাকে এভাবে গার্ড অব অনার দিতে হবে কেন? এটা কোন ধরনের রাজনৈতিক চর্চা? সম্প্রতি ওই ছাত্র সংগঠনেরই কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে মোটরসাইকেলের বিশাল বহর সহকারে রাস্তায় যেতে দেখে আরও বেশি অবাক হলাম। দেশের একটি জনপ্রিয় পত্রিকায় এই ছবি ছাপা হয়েছে। ছবির ক্যাপশনে লেখা- গাড়ির ভেতরে বসে আছেন সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য রাস্তায় মোটরসাইকেলে নেমেছে কর্মীরা। নিয়ম অনুযায়ী মোটরসাইকেলে উঠতে হলে মাথায় হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক। অথচ মোটরসাইকেল আরোহী কারও মাথায় হেলমেট নেই।
এটাকে কি আমরা সময়ের দাবি বলবো? সময় কি তাহলে এটাই দাবি করছে যে প্রভাবশালী ছাত্রনেতাকে মোটরসাইকেল সহকারে গার্ড অব অনার দিতে হবে। তিনি কোথাও বক্তৃতা দিতে গেলে আগে থেকেই ক্যাডার বাহিনীকে দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে? কিন্তু কেন? কোন যুক্তিতে এটা করতে হবে।
আমার সাংবাদিকতা জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে। ওই সময়ের দেশসেরা দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাকের রিপোর্টার হিসেবে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিল আমার গভীর সখ্য। বন্ধু ছাত্রনেতাদের অনেকেই এখন জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। যারা ছাত্রনেতা হিসেবে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের জীবন-মান উন্নয়নের আন্দোলনেও শরিক ছিলেন। অথচ বর্তমান সময়ে এমন ভূমিকার নজির নেই বললেই চলে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই ছাত্র সংগঠন আছে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ছাত্র সংগঠনই তাদের অভিভাবক রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অনেক সমস্যাই তাদের জানা নেই। আবার জানা থাকলেও তা নিয়ে খুব একটা সোচ্চার নয় কোনও ছাত্র সংগঠনই।
অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন, লেখাটা শুরু হলো দশ টাকার বাজার নিয়ে, সেখানে ছাত্র সংগঠনসমূহের প্রসঙ্গ এলো কেন? প্রশ্নটা এলো এ জন্য যে, মাত্র দশ টাকায় এই যে এতগুলো খাবার দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার মর্যাদা রাখার ক্ষেত্রে ছাত্র সংগঠনগুলোই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তারাই আওয়াজ তুলতে পারে, দশ টাকায় সমুচা, সিঙ্গারা, চপ আর এক কাপ চা খাওয়াচ্ছেন ভালো কথা; কিন্তু আমাদের অন্যান্য মৌলিক দাবিগুলোর কী হবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই যদি ধরি, একসময় হলে হলে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, নাট্য উৎসব হতো। বহু বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ছাত্র সংগঠনগুলোরই উচিত ছিল এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করার। কিন্তু কার্যত কোনও ছাত্র সংগঠনকেই এ ব্যাপারে তেমন তৎপর দেখা যায়নি।
Lovely Akter
Yorum Sil
Bu yorumu silmek istediğinizden emin misiniz?
Fam Fanoz
http://www.clixsense.com/?8172285
Yorum Sil
Bu yorumu silmek istediğinizden emin misiniz?
Habibullah Mullah
Yorum Sil
Bu yorumu silmek istediğinizden emin misiniz?
Md shah Alom
Yorum Sil
Bu yorumu silmek istediğinizden emin misiniz?
℘rơɬɨҡ Տհɑħɑ
Yorum Sil
Bu yorumu silmek istediğinizden emin misiniz?
MD Zahidul Islam
Yorum Sil
Bu yorumu silmek istediğinizden emin misiniz?
MD Shamim Khan
Yorum Sil
Bu yorumu silmek istediğinizden emin misiniz?
Mamun mia
Yorum Sil
Bu yorumu silmek istediğinizden emin misiniz?