দেশ বিদেশের টুকরো কাহিনী

ছবিঃ ইন্টারনেট

মহান টাঙ্গাওয়ালা আবু কারিম 
লুক্সরের ঘটনা। আমাদের গাইড বলে দিয়েছিল আমরা যেন ভোর সকালে উঠে নিজে থেকে এডফুর মন্দিরটি দেখে নাই। কারন সকালের নাস্তার পর আমাদের জাহাজ আসোয়ানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। হুটোপাটি করে ভোর ভোর উঠে জাহাজ থেকে নিজস্ব জেটিতে নামতেই এক টাঙ্গা। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম যখন শুনলাম চালকের নাম আবু কারিম । কারন সারা মিশরে যত লোকের সাথে পরিচিত হয়েছি তার আশি ভাগ লোকের নামই আহামাদ না হলে মোহাম্মাদ । যাই হোক টাঙ্গায় আমরা দুজন উঠে বসলাম। নীল নদীর পাড়, কুয়াশা কুয়াশা ঘেরা নিরিবিলি রাস্তা, দুপাশে বাগান করা একতালা বাড়ী। এদিকে খুবই শান্তশিষ্ট মনে হলো আমাদের শকটের ইঞ্জিনকে । আবু কারিমকে বললাম "আমাকে তোমার টাঙ্গাটা একটু চালাতে দিবে" ? সে সোৎসাহে রাজী হলো, অল্প দুরেই গন্তব্যে পৌছানোর পর আবু কারিম আমাকে ইংরাজীতে বল্লো ' ইউ আর দ্যা ফাস্ট লেডী হু ড্রোভ মাই হর্স, দ্যা কুইন অফ দ্যা নাইল তার চোখের ভাষায় যুগপৎভাবে ফুটে উঠছে এক অহংকার সেই সাথে আমার প্রতি তার অগাধ দাক্ষিন্য বর্ষন। আমি ভালো করে চেয়ে দেখলাম তার টাঙ্গার ইঞ্জিনটা ঘোড়ার মত লাগলো না একেবারেই, লাগলো ঠিক একটি গাধার মত ! 


কিংস ভ্যালির পাশ দিয়ে যাওয়া এই প্রানীটির মতই অবিকল আবু কারিমের ঘোড়াটা !!


আমাদের কেবিনের সামনে এই সিড়ি দিয়ে উঠলেই ডান দিকে ডাইনিং 
মাছ ভাজা ঃ-
এটাও সেই মিশরের নৌ বিহারের ঘটনা । সমস্ত বেলার খাওয়া দাওয়া ছিল বুফে। আমি দুপুরে খেতে গিয়ে দেখি যেই মাছ ভাজাটা আমি পছন্দ করি সেটা শেষ । আমি অন্যান্য খাবার নিয়ে খাচ্ছি তখনি মাস্টার সেফ আমার জন্য এক প্লেট মাছ ভাজা এনে আমার টেবিলে এসে আমার হাতে তুলে দিল বিশাল এক হাসি দিয়ে। কখন সে খেয়াল করলো আমি মাছ ভাজা খুজেছি। আমি বিস্মিত হয়েও তাকে বারবার ধন্যবাদ জানিয়েছি শুধুমাত্র আমার একার জন্য এতটা করেছে জেনে। নাহলে আমাদের সাথে হলিউডের এক নামজাদা অভিনেতাও তো ছিল। 


দূরে ঘুমানোর আয়োজনে ব্যাস্ত আমি, অদুরে জাপানী দম্পতি 
শীতের কম্বলঃ- 
মিশরের বাহারিয়া মরুভুমিতে রাত, অত্যন্ত ক্লান্ত আমি খেয়ে দেয়ে বালুর উপর ফোম বিছিয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। মাঝরাতে সেই গভীর ঘুম ভেঙ্গে গেল শীতের দাপটে । কুকড়ি মুকরি দিয়ে যখন আবার ঘুমানোর চেষ্টা করছি সেসময় অনুভব করলাম কে যেন আমার পাশে দাঁড়ানো। অল্প চোখ মেলতেই দেখি আমাদের সাফারীর ড্রাইভার কাম গাইড আহামাদ হাতে একটা কম্বল নিয়ে দাঁড়িয়ে, তারপর আস্তে আস্তে আমাদের ঢেকে দিয়ে গেল উষ্ণ এক বালুময় কম্বল দিয়ে । সে কিন্ত আমাদের থেকে অনেক দূরে ছিল তারপর তার স্নেহ দৃষ্টি সবার উপরেই ছিল ।


রামা ১ ব্রীজের পাশে রাজা ভুমিবলের চিতার রেপ্লিকা 
হাত বাড়ানো ঃ- থাইল্যান্ডের রাজা ভুমিবলের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে । সারাদেশ জুড়ে অনেকগুলো রেপ্লিকা তৈরী হয়েছিল । চাও-প্রায়া নদীর ধারে প্রথম রামা ব্রীজের কাছেও একটা তৈরী হয়েছিল। সেটার পাশেই ব্যংককের সবচেয়ে বড় ফুলের বাজারের ফুল বিক্রেতারাও অনিন্দ্য সুন্দর ভাবে ফুল দিয়ে সেখানে রাস্তাঘাট সাজিয়েছে । আমি এটা দেখার জন্য বাসে করে রওনা দিয়েছি । গন্তব্যের আগের বাস স্টপেজে বাস থামলে আমি একজনের কাছে জানতে চাইলে সে বল্লো না পরের স্টপেজ যেটা লাস্ট স্টপেজ। সেখানে আসতেই মেয়েটি আমার হাত ধরে আস্তে আস্তে বাস থেকে নামিয়ে আনলো তারপর ধরে ধরে রাস্তা পার করালো ( বিশ্বাস করেন হাত ধরে খালি রাস্তা পার করে দেবার মত এত বুড়ো হইনি আর সেই রাস্তায় গাড়ী চলাচল বন্ধ ছিল, আমি সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকলেও গাড়ীর নীচে পড়তাম না এইটা শিওর কইলাম) তারপর নির্ধারিত যায়গায় এসে আমার হাত ছেড়ে মাথা ঝুকিয়ে বল্লো আমার কি আর কোন সাহায্যের দরকার আছে ? আমি কৃতজ্ঞতার সাথে ধন্যবাদ জানিয়ে হাসি মুখে বললাম "এখন আমি নিজেই সব দেখে শুনে নিতে পারবো"। 

বিপরীত চিত্রঃ- হাত বাড়িয়ে দেয়ার ঘটনার কিছু দিন আগে এক শপিং মলে দোতলা থেকে একতালায় শেষ ছোট সিড়িটি নজরে না আসায় সোজা পপাত ধরনীতল । করিডোরের পাশেই একটা ট্যুর অপারেটরের দোকান সেখানে চার পাচজন কর্মী তো ছিলই এছাড়া গোটা বিশেক লোক আমার পাশ দিয়ে এপার ওপার করলো । আমি পরে আছি খবর নেই। কেউ জিজ্ঞেশ পর্যন্ত করলো না কি হয়েছে। একটু পরে অসহ্য ব্যথা নিয়ে আস্তে আস্তে উঠে সামনে বসার যায়গায় গিয়ে বসলাম। হাটুর হাড়টা মনে হয় ভেঙ্গেই গিয়েছে এই অবস্থা, করকর করছিলো। মনে মনে ভাবছিলাম যখন আমার সাহায্যের দরকার ছিলো না তখন আমার হাত ধরে রাস্তা পার করে দাও আর এখন যখন আমার সত্যি সাহায্যের দরকার তখন