ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত...

জ্বী, এই আবু লাহাবই সেই আবু লাহাব। যার জন্মের সংবাদ পেয়ে প্রফুল্ল চাচা খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন

মুহাম্মাদ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেদিন জন্ম হয়, সেদিন একজন লোক পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে কুরাইশদের এ বাড়ি থেকে ও’বাড়ি, এ পাড়া থেকে ও’পাড়া, জনে জনে খবর দিতে লাগলো, ‘শোন লোকসকল! আমার মৃত ভাই আবদুল্লাহর ঘরে একটা ফুটফুটে পুত্র সন্তান এসেছে। তার বংশ রক্ষা পেয়েছে’। যে লোক পাগলপারা হয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের সংবাদ সর্বত্র বিলাচ্ছিলো, তার নাম হলো আবু লাহাব। সম্পর্কে তিনি রাসূলের আপন চাচা। আব্দুল মুত্তালিবের দশজন পুত্রের একজন। শুধু কি তাই? মুহাম্মাদ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের সংবাদ সর্বপ্রথম যে দাসী তার কাছে নিয়ে আসে, ভাতিজার জন্মের সংবাদে খুশিতে উৎফুল্ল চাচা আবু লাহাব ছুওয়াইবা নামক সেই দাসীকেও মুক্ত করে দিয়েছিলো সাথে সাথে। ভাতিজার পৃথিবীতে শুভাগমের সংবাদে তিনি এতোটাই প্রফুল্ল ছিলেন।
প্রশ্ন করতে পারেন, ‘এটাই কি সেই আবু লাহাব যার ধ্বংস কামনা করে কুরআনে একটা পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়েছে?’
জ্বী, এই আবু লাহাবই সেই আবু লাহাব। যার জন্মের সংবাদ পেয়ে প্রফুল্ল চাচা খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন, সেই চাচাই পরে রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়। হিদায়াত কপালে না থাকলে যা হয়!
নব্যুয়াত প্রাপ্তির পরে, যখন প্রকাশ্য দাওয়াতের হুকুম এলো, এক সকালবেলা রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার সাফা পর্বতের উপরে আরোহন করে লোকদের ডাকতে লাগলেন। মুহাম্মাদ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডাক শুনে সাফা পর্বতের কিনারায় লোকেরা এসে উপস্থিত হয়। তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন, ‘হে আমার দেশবাসী! আমি যদি বলি এই পর্বতের অপর প্রান্তে একদল শত্রু তোমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য অপেক্ষা করছে, তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?’
লোকেরা সমস্বরে বলে উঠলো, ‘আলবৎ করবো। কেননা, আমরা তোমাকে সত্যবাদী হিসেবে পেয়েছি, ও মুহাম্মাদ’।
তাদের জবাব শুনে রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে উঠলেন, ‘আমি কিয়ামতের পূর্বে তোমাদের কাছে সতর্ককারীরূপে নাযিল হয়েছি। ‘হে কুরায়েশগণ! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! হে বনু কা‘ব বিন লুআই! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! হে বনু আবদে মানাফ! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! হে বনু হাশেম! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! হে বনু আব্দিল মুত্ত্বালিব! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! হে আববাস বিন আব্দুল মুত্ত্বালিব! আল্লাহর আযাব থেকে নিজেদের বাঁচাও। কিয়ামতের মাঠে আমি তোমাদের কোনই কাজে আসবো না’।
সাফা প্রান্তরে সেদিন উপস্থিত লোকদের মধ্যে আবু লাহাবও ছিলো। রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই কথাগুলো বলতে শুনে তিনি খুব বিরক্ত হলেন। নিজের অহংকার, অহমিকা, ঔদ্ধত্যের চূড়ান্ত সীমা প্রদর্শনপূর্বক বললেন, ‘মুহাম্মাদ, তোমার পুরো দিনটাই মাটি হোক। তুমি কি সকাল সকাল এসব কথা শোনানোর জন্যেই আমাদের এখানে সমবেত করেছো?’
সত্য প্রত্যাদেশ শুনে প্রিয়তম চাচা আবু লাহাব বেঁকে বসে। যারা বাপ-দাদাদের ধর্মের অন্ধ অনুসারী, তারা সহজাত সত্যকে সাদরে গ্রহণ করার মতো সৎ সাহস খুব একটা রাখেনা। আবু লাহাবেরও ছিলো না। শুধু আবু লাহাব নয়, আবু লাহাবের স্ত্রী, রাসূলের চাচী উম্মে জামিলও নানানভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ত্যক্ত-বিরক্ত করতো। কবিতা রচনায় পটু ছিলেন এই মহিলা। কবিদের মতো করে কটু বাক্যে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক আক্রমণ করতো সে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে যখন বিষিয়ে তুলছিলো রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন, যখন অতিষ্ট করে তুলছিলো তাঁর দৈনন্দিন জীবনকে, অবাধ্যতার চরম সীমায় পৌঁছে যখন তারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আর বিষ বাক্যে জর্জরিত করছিলো রাসূলকে, তখন আল্লাহ তা’য়ালা নাযিল করলেন সূরা লাহাব, যে সূরায় আল্লাহ নিজেই ধ্বংস হবার কথা বলেছেন আবু লাহাব এবং তার স্ত্রীকে। বলেছেন,
‘ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং ধ্বংস হোক সে নিজে। কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ এবং যা সে উপার্জন করেছে, তা। শীঘ্রই সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনের শিখায়। এবং তার ইন্ধন বহনকারী স্ত্রীও। তার গলদেশে রয়েছে খেঁজুরপত্রের পাকানো রশি’।
এই সূরাটি যখন নাযিল হচ্ছিলো, তখন আবু লাহাব এবং তার স্ত্রী দু’জনেই বর্তমান। তাদের সামনেই মুসলিমরা এই সূরাটি তিলাওয়াত করছিলো। মজার ব্যাপার হলো, আবু লাহাব এবং তার স্ত্রীর হাতে কিন্তু দারুন একটা সুযোগ ছিলো কুরআনকে ভুল প্রমাণ করার এবং মুহাম্মাদ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নব্যুয়াত নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তোলার। কীভাবে? এই সূরা নাযিল হওয়ার পর যদি তারা দু’জনে ঈমান নিয়ে আসতো, যদি মুসলিম হয়ে যেতো, তাহলে সূরা লাহাবের ঠিক কি হতো? ঈমান এনে মুসলমান বনে যাওয়া কারো বিরুদ্ধে কুরআন অনবরত অভিশাপ বর্ষণ করছে- তেমনটা শোভা পায় কি? যদি দু’জনে মুসলমান হয়ে যেতো, সূরা লাহাব বাতিল বা উঠিয়ে নেওয়ার কোন সুযোগ ছিলো কি? ছিলো না... তাহলে, আবু লাহাব আর তার স্ত্রী যদি তখন সত্যি সত্যিই মুসলমান হয়ে যেতো, ব্যাপারটা কেমন হতো?
কিন্তু না। এই সত্য প্রত্যাদেশ যেখান থেকে আসা, যার কাছ থেকে আসা সেই মহান প্রভু তো জানেন তারা দু’জন কখনোই ঈমান আনবেনা। তারা মুশরিক হয়েই মৃত্যুবরণ করবে।
হলোও ঠিক তাই। এই সূরা নাযিলের আরো দশ বছর পরে তারা মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু এই দশ বছরে তারা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কোনভাবেই ঈমান আনেনি। ঈমান এনে কুরআনকে ভুল (!) প্রমাণ করে ফেলার এক দারুন সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই সুযোগ গ্রহণ করেনি দুই মুশরিক। কি অদ্ভুত না? এটাই আল কুরআনের মুযিযা!
ঈমাম ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহু আলাই এর মতে, এই সূরাটা মুহাম্মাদ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নব্যুয়াতের সত্যতার পক্ষে একটা অন্যতম শক্ত দলিল। অর্থাৎ তিনি যে সত্য নবী ছিলেন, কুরআন যে ঐশী বিধান, সেটা এই সূরা এবং এর নাযিলের প্রেক্ষাপট থেকেই পরিষ্কার।
আরেকটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, ‘আবু লাহাব’ কিন্তু তার আসল নাম নয়, উপাধি। তার আসল নাম ছিলো আব্দুল ওযযা যার অর্থ ‘ওযযা দেবীর গোলাম’। কুরআন তাকে তার আসল নাম ধরে সম্বোধন না করে তার ছদ্মনাম বা উপাধি ধরে সম্বোধন করেছে। কেনো জানেন? কারণ তার আসল নাম (আব্দুল ওযযা বা ওযযা দেবীর গোলাম) তাওহীদের পরিপন্থী। দুনিয়ার কোন মানুষ, হোক সে মুশরিক বা কাফের, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো গোলাম হতে পারেনা। কুরআন এসেছে তাওহীদ তথা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতে। আবু লাহাবের আসল নাম তাওহিদের সাথে সাংঘর্ষিক বলে কুরআন এই নাম ব্যবহার করেনি। চিন্তা করতে পারেন কতো সুক্ষ্মচিন্তার বিষয় এটা? এটাও কুরাআনের একটা মুযিযা।
যদি রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য নবী না হতেন, তাহলে তিনি কোনভাবেই আবু লাহাব এবং তার স্ত্রীর ব্যাপারে এরকম ভবিষ্যতবাণী করতে পারতেন না। সে সময় মক্কায় আরো এমন অনেকে ছিলো যারা রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অন্যায়, অত্যাচারে কোনদিকেই আবু লাহাব এবং তার স্ত্রীর চেয়ে কম ছিলো না। উদাহরণস্বরূপ আবু সুফিয়ান এবং তার স্ত্রী হিন্দার কথা বলা যায়। প্রথমজীবনে আবু সুফিয়ান তো মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে এক তুখোড় যোদ্ধা ছিলো। প্রচুর মুসলিমরা তাঁর হাতে শাহাদাত বরণ করে। আর হিন্দা তো সেই মহিলা যে যুদ্ধের ময়দানে রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত চাচা হামযা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিলো। তবুও কুরআনে আবু লাহাব এবং তার স্ত্রীর ব্যাপারে যেরকম অভিসম্পাত করে সূরা নাযিল হয়েছে, সেরকম কোনকিছু আবু সুফিয়ান বা তার স্ত্রী হিন্দার ব্যাপারে নাযিল হয়নি। এর কারণ আল্লাহ জানতেন আবু সুফিয়ান এবং তার স্ত্রী জীবনের একটা পর্যায়ে ঈমান আনয়ন করবে, এবং হলোও তাই। আবু সুফিয়ান এবং তাঁর স্ত্রী দু’জনেই পরে মুসলিম হোন। এই ঘটনা থেকে কি এটা প্রমাণ হয়না যে কুরআন কোন মানুষের রচিত কিতাব নয় এবং মুহাম্মাদ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত রাসূল?
 
লেখক: আরিফ আজাদ