রং নাম্বার (রম্য)

জীবন সংকটের ভিতরে পড়ে গেছি।বেঁচে থাকলে দেখা হবে। বলেই কলটা কেটে দিয়ে ফোন থেকে সিমটা বার করে পুকুরের পানিতে ফে?

দু'মাস ঘ্যানর ঘ্যানর করার পর বাজান একখানা ফোন কিনে দিছে এবার। ৬" স্মার্ট ফোন। ফোন হাতে পেয়েই কিপ্টুস বাপের দীর্ঘায়ূ কামনা করেই খু্শিতে লাফ দিয়ে উঠলাম। ফোনটা কিনেই চলে গেলাম বন্ধু "বল্টুর" বাড়ি।সালা আমাকে বহুত অপমান করছে সব সুদে আসলে তুলবো। গতবার ঈদে আমারে একটাও সিঙ্গেল সেল্ফি তুলতে দেয় নি।সেল্ফি তুলতে চাইলেই বলতো 'পারলে ফোন কিনে সেল্ফি তুলিস'।এবার তার হাতে দিয়ে বলবো নে যত ইচ্ছে সেল্ফি তুল।পারলে এতোদিনে তোর ফোনে যা সেল্ফি তুলেছি তার ডাবল ছবি তুলে নে। আমি তোর মত ওমন কঞ্জুস না। ফোন যেহেতু কিনেছি সিম কার্ড ও তো থাকতে হবে।তা না হলে ফোনটা আমার কোনো রকম সংযোগ ছাড়া মা মরা ছেলের মত এতিম হয়ে যাবে। এখন আবার ডিজিটাল বুদ্ধি সালার সিম কোম্পানীর লোকদের। ভোটার কার্ড ছাড়া নাকি সিম দিবে না। কিন্তু সিম তো আমার চায়ই চাই। এদিকে নিজেরও ভোটার কার্ড বার হয় নি যে বাপের পকেট থেকে টাকা মেরে একটা সিম কার্ড কিনে নিবো। মনের দুঃখে মাথাতে হাত দিয়ে বলতে লাগলাম। "বাজান তুমি ফোন দিলা সিম তো দিলা না" বাজানের কথা কইতেই মাথাতে শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেলো। বাজানের তো তিনটা সিম। দুটো ফোনে ঢুকানো আছে আর একটা বন্ধ। বন্ধ সিমটা আজকে রাতেই সুযোগ বুঝে ঝেড়ে দিবো।রাতে সবাই যখন টি-ভি দেখাতে ব্যস্ত।তখন আমি আমার স্বার্থ হাসিলের জন্য বাবার রুমে টুপ করে ঢুকে ছান মেরে খুঁজতে লাগলাম। অবশেষে সব খুঁজার পর বাবার খাটের নিচে জুতার বাস্কে সিম পেলাম। আমার বাজানটা না সত্যি একটা খাচ্ছরের ঘরের খাচ্ছর।তা না হলে সামান্য সিম কেউ এতো গোপন জায়গাতে লুকিয়ে রাখে। সিম হাতে পেয়ে খুশি মনে লাফাতে লাফাতে বার হয়ে এসে নিজের রুমে ঢুকলাম। বাজানের বন্ধ সিমটা ফোনে ঢুকাতেই রিতিমত টাস্কি খেয়ে গেলাম। ও মোর খুদা,জীবনে আমারে কোনোদিনও দশটা টাকা খুশি মনে দিলো না।আর সিমে ৫০০ টাকা রেখে দিছে! ব্যালেন্স এ এতো টাকা দেখে তো লুঙ্গি ড্যান্স করতে ইচ্ছে করছে আমার। তবে দুঃখ জনক হলেও আমার সহৃদয় বন্ধুদের অত্যাচারে লুঙ্গীকে ডিভোর্স দিয়ে দিছি সেই বছর কয়েক আগে। সে ঘটনা না হয় আরেক দিন বলবো। কতক্ষণ নাগীন ড্যান্স করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে খাটে সুয়ে পড়লাম। মাঝরাত,তবুও কিছুতেই ঘুম আসছে না। মাথার ভিতরে বাজানের সিমে থাকা টাকা গুলো ফুরানোর চিন্তা মাথাতে চক্রাকারে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে। বালিশে মুখ দিয়ে সুয়ে সুয়ে ভাবছি,এতো গুলো টাকা, বাজানরে তো সিম ফিরত দেওয়া যাইবো না।আজ যখন সুযোগ পাইছি তখন টাকা গুলান সব শেষ করুম। এদিকে কোনো জি এফ ও নাই যে তার লগে সুখ-দুঃখের কথা কইয়ে আলগা পিরিত দেখিয়ে টাকা গুলোর গড়ের মাঠ করমু। সাথে সাথে রিয়াজ কাক্কুর "রং নং" সিনেমার কথা মনে পড়ে গেলো। চান্স মার ছোটু,লাগলেও লেগে যেতে পারে। কোনো একটা রূপবতী কন্যার সন্ধ্যান। ডায়াল লিষ্টে গিয়ে আমার সিমের লাষ্ট একটা ডিজিট চেঞ্জ করে কল দিলাম। ওপাশে রিং বাঁজছে আর এদিকে আমার মনে লাড্ডু ফুটছে। কোন ললনা যে ভাগ্যে আছে কে জানে। পর পর দু'বার কল দিলাম।কিন্তু ওপাশে ললনা তো দুরের কথা কোনো হুংড়ি বুড়িও রিসিভ করলো না। মনের দুঃখে আবারো লাষ্ট বারের মত ট্রাই করলাম।এবার রিসিভ করলে ভালো নইতো অন্যখানে ট্রাই মারবো। নাহ্ হলো না। নং চেঞ্জ করে অন্যখানে ট্রাই করতে থাকলাম। ইতিমধ্যে অনেকেই রিসিভ করছে,কিন্তু সালার পোড়া কপাল সব গুলোই পুরুষ মানুষ। আমিও কি কম চালাক নাকি,যেই দেখছি ছেলে কণ্ঠ তখন আমার যে কোনো একটা ফ্রেন্ডের নাম করে বকাবকি দিয়ে সোজা ব্লকলিষ্টে ফেলে দিচ্ছি। ধরলে বাজানরে ধরবে,সিম তো আর আমার না। এভাবে একের পর এক ট্রায় করতে করতে লাড্ডুটা আমারো ফাটলো। দু'বার বাজতেই ওপাশ থেকে ঘুম ঘুম কণ্ঠে একটা অচেনা ললনা বলে উঠলো। :-হ্যালো। আহ্ হ্যালো শুনে হৃদয়ের ফিউজ বাল্বটা ধপ করে জ্বলে উঠলো।কিছুক্ষণ পর আবারো হ্যালো বললো।এবার বুকে দম নিয়ে আমিও বললাম। :-হ্যালো। ওপাশ থেকে বলে উঠলো। :-কে আপনে,এতো রাতে ফোন দিছেন কেন? :-আসলে ঘুমের ভিতরে একটা রোমান্টিক স্বপ্ন দেখলাম তো তাই। :-স্বপ্ন দেখলেন তো আমাকে ফোন দিছেন কেন? :-স্বপ্নটা তো আপনাকে নিয়েই দেখেছি। চরম একটা ফাপড় মেরে দিলাম। এরপর ধাপেধাপে সতর্কের সাথে কথা এগিয়ে যেতে লাগলাম। জীবনে ১ম বার কোনো মেয়েকে পটাতে যাচ্ছি।মনের ভিতরে বসন্তের সব হাওয়া একসাথে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। বেশিক্ষণ কথা বললে বিপরীত হতে পারে তাই অচেনা ললনাকে ঘুমাতে বলে কলটা কেটে দিলাম। পরদিন সকালে আবারো কল দিলাম। কি করে,খেয়েছে কিনা,কি দিয়ে খেয়েছে,হাবজাব প্রশ্ন করে কথা বাড়িয়ে চললাম ধিরে ধিরে।এক পর্যায়ে পরিচয় নিয়ে জানতে পারলাম। অচেনা ললনা আমার পাশের এলাকাতে থাকে।নাম 'রুহি।কথাটা শুনে তো মনের ভিতরে বাকবাকুম পায়রা গান গাইতে লাগলো। এভাবে রুহির সাথে কথার পিঠে কথা চালিয়ে ইমপ্রেস করতে লাগলাম। আজ একসপ্তাহ হলো, ফোনে রুহির সাথে কথার বিনিময় করছি।এদিকে ফোনের ব্যালেন্সটাও শুন্যর দিকে।বাবার টাকা তো শেষ হয়ছেই সাথে এই কইদিনে আমার জমানো ২০০০ টাকার শ্রাদ্ধ করে দিয়েছি। তাই ভাবলাম এবার প্রপোজ টা করেই ফেলি।ব্যালেন্স শেষ হলে আমার কিপ্টুস বাজানের জন্য আর কখনো রিচার্জ করতে পারবো না।আর তখন ময়না আবার অন্য খাঁচায় গিয়ে ঘর বাঁধবে। কিন্তু ফোনে প্রপোজ করার থেকে সামনে থেকেই করাটা শ্রেয় হবে। তাই রুহিকে দেখা করার কথা বললাম। মেয়েটা নাহু নাহু করলেও আমার জোরাজোরিতে রাজি হয়ে গেলো। দেখা করার জায়গা ঠিক করা হলো 'ন্যাড়া দীঘির পুকুর পাড়,শুক্রবার বিকেলে। পুকুরের নামের ইতিহাস জানতে চেয়ে কেউ লজ্জা দিবেন না।কারণ মাঝে মাঝে আমিও ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে পুকুর পাড় থেকে পাতিহাসের ডিম নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। তবুও সত্যান্বেষণ এ সফল হতে পারি নি। আমিও একটু রোমান্টিক হয়ে বললাম। নীল শাড়ি আর কাঁচের চুড়ি পরে আসবা। রুহি ঠিক আছে বলেই ফোন কেটে দিলো। যতরকমের ফেস ক্রিম আছে সব মুখে মাখলাম। হাজার হলেও প্রপোজ করার জন্য দেখা করতে যাবো। একটু তো গ্লামার থাকতেই হয়। চুলে জেল গায়ে তেল মেখে পরিপাটি হয়ে বার হয়ে গেলাম। হাটছি আর ভাবছি কোন নায়কের স্টাইল কপি করে প্রপোজ করা যাই। অনেক ভেবে চিন্তে সাল্লু ভাইয়ের "মুজে স্বাদি কারোগি"মুভির প্রপোজ স্টাইলটা মনে ধরলো। নায়ক নায়ক অ্যাটিটিউড নিয়ে এগিয়ে যাাচ্ছি পুকুর পাড়ের দিকে। কিন্তু পুকুর পাড়ে গিয়ে টাস্কি খেলাম। দেখি পুকুর পাড়ে আমার জরিনা ফুফু দাড়িয়ে আছে।সম্পর্কে আমার দাদার বোনের মেয়ে।বয়স আনুমানিক ৪৬ হবে। এখনো মনপছন্দ মত ছেলের অভাবে বেচারির বিয়েটা হয় নি। কিন্তু তার এখানে কি কাজ। এখানে তো রুহির আশার কথা ছিলো। ফুফুরে দেখে গাছের আঁড়ালে গিয়ে দাড়ালাম। "এখানে ফুফু কি করে।তাউ আবার নীল শাড়ি পরে। তারমানে কি রুহিই।ভাবতেই হৃদয়টা আমার হাহাকার করে কেঁদে উঠলো। নাহ্ নাহ্ এ হতে পারে না। আমি তো রুহির সাথে কথা বলতাম।আর তার কণ্ঠটাও তো ষোল বছরের এক তরুনির মত। আর এইটা তো এক্সপায়ার্ড হওয়া জিনিস। এর কণ্ঠ এতো সফট হতেই পারে না। কাপা কাপা হাতে পকেট থেকে ফোনটা বার করে রুহির নং এ কল দিলাম। দেখি জরিনা ফুফু ব্যাগ থেকে ফোন বার করে কানে ধরছে। ভয়ে তো আমার হাত-পা সব একসাথে কাপতে শুরু করে দিছে অলরেডি। এখন দেখি নতুন জীবন শুরুর আগে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মরতে হবে। জরিনা ফুফু বলতে লাগলো। :-কোই তুমি? আমি সেই কখন থেকে পুকুর পাড়ে এসে দাড়িয়ে আছি। আমি দু তিনটা ঢোক গিলে নিয়ে বললাম। :-আমি আসতে পারবো না। :-কেন আসতে পারবে না? :-জীবন সংকটের ভিতরে পড়ে গেছি।বেঁচে থাকলে দেখা হবে। বলেই কলটা কেটে দিয়ে ফোন থেকে সিমটা বার করে পুকুরের পানিতে ফেলে দিলাম। ভাগ্যিস আমারে স্বচক্ষে দেখে নি। তাহলে তো আমার জীবনটা বি-টিভির মত করে দিতো। কাউকে দেখানোর লায়েক থাকতো না আর। ঢের শিক্ষা হয়ে গেছে,রং নং এ প্রেম করার। প্রেম তো হলোই না বরং মাঝখান থেকে আমার এতোদিনের জমানো ২০০০ টাকার পিন্ডি দান হয়ে গেলো। অবশেষে জীবনের ১ম প্রেমে হতাশ আমি। জরিনা ফুূফুর প্রেম ছ্যাকা খেয়ে ব্যাকা হয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। "কার দেখাবো মনের দুঃখ রে.. আমি বুক চিরিয়া। গানটা গাইতে গাইতে।