সকালে নাস্তা করার সময় হঠাৎ করে ঝুম বৃষ্টি নামলো। আমার পাশে আমার পাঁচ বছর বয়েসি খালাতো ভাই বসা। বৃষ্টি দেখে সে অতি উৎসাহ নিয়ে চোখ বড় বড় করে আমাকে বলল, ভাইয়া দ্যাখো, বৃষ্টি পড়তাছে।
খালাতো ভাইয়ের মা, অর্থাৎ আমার খালামণি একটু দূরে দাঁড়িয়ে কমলা চিপে চিপে রস বের করে জুস বানাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে তিনি ডিসি কমিক্সের সুপারহিরো ফ্লাশের মত বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে এসে খালাতো ভাইয়ের গালে ‘ঠাস’ করে চড় বসিয়ে দিলেন।
অতর্কিত এই হামলায় আমি এবং খালাতো ভাই দুইজনই বেশ হকচকিয়ে গেলাম। খালাতো ভাই সবেমাত্র সেদ্ধ ডিম মুখে নিয়েছিলো, চড়ের প্রকোপে সেই ডিম মেঝেতে পড়ে গেলো। আমি পিচ্চির পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখছি এবং চিন্তা করছি কোন দোষের জন্য তাকে চড় মারা যেতে পারে?
আমাকে বেশিক্ষণ চিন্তা শক্তি ব্যয় করতে হলো না। চড় মারার রহস্য উন্মোচন খালামণি নিজেই করলেন। পিচ্চির দিকে বঙ্গবন্ধুর মত আঙ্গুল নেড়ে বললেন, তোমাকে কতবার বলেছি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে! বলেছি না, মুখে যেন ঢাকাইয়া ভাষা না শুনি! ‘বৃষ্টি পড়তাছে’ এটা কোন ভাষা ,বেয়াদব! বলতে হবে – ‘বৃষ্টি পড়ছে।’ এখন যাও ভাইয়াকে সরি বলো। সরি বলার পর ঐ কথাটা আবার শুদ্ধ ভাষায় বলবে।
খালাতো ভাই অশ্রুজল গোপন করে কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে মৃদুস্বরে বলল, সরি ভাইয়া, বৃষ্টি পড়ছে।
আম্মুকে নিয়ে নানাবাড়ি গেলে একটা সাজসাজ রব পড়ে যায়। আম্মুর বোনদের মধ্যে আম্মুই বাপের বাড়ি থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বে থাকে। বছরে একবার যায়। কাজেই আম্মু নানাবাড়িতে গেলে আম্মুর বাকি বোনেরাও তাদের পিচ্চি-পাচ্চা নিয়ে হাজির হয়।
আম্মু এবং তার বোনেরা সবাই মিলে উঠোনে বসে যে যার নিজের শ্বশুর-বাড়ির গুণগান বিষয়ক ‘আমার শ্বশুর-বাড়িই শ্রেষ্ঠ’ শীর্ষক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নেয় এবং একে অন্যের মাথার উঁকুন বেছে দেয়। আর আমি খালাতো-মামাতো পিচ্চি ভাইবোনদের (যাদের কারোর বয়েসই ছয় পার হয় নি) সমন্বয়ে গঠিত ছোটো খাটো একটা ক্রিকেট টিম নিয়ে বনে বাঁদড়ে এবং পুকুর ঘাটে ঘুরে বেড়াই।
চড়-মারা বিষয়ক ঘটনায় আমার বাকি খালামণিরা এবং তাদের সন্তানরাও উপস্থিত ছিলো। সবাই একসাথেই নাস্তা করতে বসেছি। ঘটনা ঘটার পর আমি খুব নীরবে নাস্তা শেষ করলাম। চা এর কাপ হাতে নিয়ে ‘চড়-মারা’ খালামণিকে বললাম, আন্টি, তুমি নাস্তা খাইসো?
খালামণি বললেন, হা খাইসি।
আমি চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, উহু, হইলো না। তোমার বলা উচিৎ ছিলো- হ্যাঁ খেয়েছি। হ্যাঁ এর উপরে চন্দ্রবিন্দু আছে, কাজেই ওইটা নাক দিয়ে বলতে হবে। তুমি এখন আমাকে সরি বলো। সরি বলার পর বলো- হ্যাঁ খেয়েছি।
খালামণি চুপ করে আছেন। আমি বললাম, আন্টি শোনো, ভাষায় কোনো শুদ্ধ, ঢাকাইয়া, গেয়ো খেত স্টান্ডার্ড নাই। টেক্সটে পড়ো নাই- মনের ভাব প্রকাশ করাই হইলেই হইলো। হুদাই ভেদাভেদ করতেছো কেন?
ছোটবেলায় আমার জন্যও বাড়িতে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ ছিলো। আমার বাবা মাঝে মাঝে মুখ ফসকে আঞ্চলিক ঢাকাইয়া ভাষা বলে ফেললে, আম্মু সাথেই সাথেই গর্জন দিয়ে উঠতো- এই তোমাকে না বলেছি বাচ্চাদেরর সামনে এইসব আলতু ফালতু কথা বলবে না। তোমার কাছ থেকেই তো বাচ্চারা এইসব শিখে।
এই ভাষা কারাগারের মধ্য থাকতে থাকতে আমি আমার আঞ্চলিক ভাষা একটুও আয়ত্তে আনতে পারি নি। এই ব্যাপারটা আমাকে খুব পোড়ায়। ভার্সিটি ক্যাম্পাসের সহপাঠীরা খুব সুন্দর করে নিজের ভাষায় কথা বলে। খুলনার সহপাঠীরা একে অন্যের সাথে কথা বলার সময় খুলনার ভাষা ব্যবহার করে, তখন অবাক হয়ে তাদের কথা শুনি। চট্টগ্রামের ছেলেপুলে একজন আরেকজনের সাথে কথা বলার সময় মনে হয় ভীনগ্রহের দুই প্রাণী কথা বলছে।
আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা এই মানুষগুলো ঠিক সময় মতো যেখানে শুদ্ধ ভাষা বলার দরকার,সেখানে শুদ্ধ বলতে পারে। অথচ আমি চাইলেও আঞ্চলিক ভাষা বলতে পারি না। বলতে চেষ্টা করলে শুদ্ধ এবং আঞ্চলিক মিশ্রিত এক বিশ্রি জগাখিচুড়ি উৎপন্ন হয়।
ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র একটা কথা আমার খুব পছন্দের। তিনি বলেছিলেন , আমার মা যদি গ্রাম্য ভাষায় কথা বলে লজ্জা না পান, তাহলে আমারো লজ্জা পাওয়া উচিৎ না। আমার মা যে গ্রাম্য ভাষায় কথা বলেন,সেই গ্রাম্য ভাষাই আমার মাতৃভাষা। বইয়ের ভাষা না।
তসলিমা নাসরিন এবং হুমায়ূন আজাদ একই টাইপের একটা কথা একটু এদিক ওদিক করে বলে গেছেন- ভাষায় কোনো শুদ্ধ অশুদ্ধ নেই, নেই শ্লীল-অশ্লীল, ভাষা হলো ভাষা।
সেদিনের সকালের নাস্তাটা ছিলো আমার আম্মু এবং খালামণিদের জন্য একটা ছোটোখাটো শিক্ষাসফর। উক্ত ভাষণ তাদের সামনে পেশ করার পর আমি আমার খালাতো-মামাতো পিচ্চি গুলোর দিকে তাকালাম। তাকিয়ে রাজনৈতিক নেতার মতো বললাম, প্রাণ প্রিয় ভাই ও বোনেরা আমার, তোমাদের মুখে যা আসে তোমরা তাই বলবা, আম্মু মারলেও বলবা। এখন আমি ওয়ান টু থ্রি বলার সাথে সাথে সবাই চিৎকার করে বলবা, বৃষ্টি পড়তাসে। রেডি ওয়ান টু থ্রি......
বাচ্চারা হাসতে হাসতে চিৎকার দিলো- বৃষ্টি পড়তাসে।
ভাষা আন্দোলন হয়েছিলো মাতৃভাষার জন্য, বইয়ের শুদ্ধ ভাষার জন্য না। অভ্র’র সেই স্লোগানটা আমার প্রিয়- ভাষা হোক উন্মুক্ত।
তবে সব ক্ষেত্রে ভাষা বেশি উন্মুক্ত হয়ে গেলে আবার সমস্যা। উদাহরণ স্বরূপ কথাসাহিত্যিক ও পরিচালক হুমায়ূন আহমেদের একটা ঘটনা দিয়ে লেখা শেষ করি।
হুমায়ূন আহমেদ এক বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। বাড়ির কর্তা কোন এক ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। তিনি হুমায়ূন আহমেদকে সোফায় বসিয়ে লেকচার দিচ্ছেন, বুঝলেন ভাই, ভাষার কিন্তু এখন একদম বেড়াছেড়া অবস্থা। মুখের ভাষার কি শ্রী একেকজনের। ভাষা হবে শুদ্ধ। এখনকার বাবা-মা’রা সাহিত্য পড়ে না। নিজেরাও ভাষা বিষয়ে মূর্খ্য, ছেলে মেয়েদেরকেও কিছু শেখাতে পারে না।
ঠিক এমন সময় উক্ত ভাষাবিদ শিক্ষকের পুত্র-সন্তান সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ঘরে প্রবেশ করলো। পুত্রের বয়েস চার-পাঁচ হবে। পুত্র ন্যাংটো অবস্থাতেই হুমায়ূন আহমেদের দিকে তাকিয়ে হাস্যমুখে বলল, হাইগ্যা আইলাম।
#collected
mehedi24
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Tanver Hassan
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
rana hosen
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Sk Masud Rana
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?