[জাপান-কাহিনি] জাপানি শিশু শিক্ষা
জাপান কেন শিশু শিক্ষায় বিশ্বের শীর্ষস্থানে আছে ?
(ক) শিশু শিক্ষায় ব্যয় করে সবচেয়ে বেশি
(খ) পড়াশুনার মান ভাল
(গ) শিশুগুলোর মগজ ভালো
আমার সবজান্তা বন্ধুকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাস করতেই সে ক্ষেপে গেল। বলল, তোর প্রশ্নের মধ্যে একটু চালাকি আছে, তুই ধরেই নিয়েছিস জাপান শীর্ষস্থানে আছে। আগে শীর্ষস্থান প্রমাণ কর। তারপর কি কারণে শীর্ষস্থান তা জিজ্ঞাস কর। কিন্ডারগার্টেন এর কি কোন বিশ্ব র্যাঙ্কিং আছে?
তাইতো, বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিং আছে, কিন্তু কিন্ডারগার্টেনের র্যাঙ্কিং?
আমি গুগোল চাচ্চুকে জিজ্ঞাস করলাম। চাইনিজ এক পত্রিকা জাপান শিশুশিক্ষায় শীর্ষস্থানে থাকার ১৪ টি কারণ উল্লেখ করেছে। কিন্তু শীর্ষস্থানে কারা আছে সে তথ্য নেই। ১৪ টি কারণ বিশ্লেষণ করার আগে কিন্ডারগার্টেন নিয়ে কিছু কথা বলি-
(১) Kinder Garten শব্দটি এসেছে জার্মান ভাষা থেকে। কারণ শিশু শিক্ষার এই কনসেপ্টটি তাঁদের আবিষ্কার। সেই ১৭৭৯ সালে। জার্মান ভাষায় Kinder মানে শিশু আর Garten মানে হলো বাগান। অনেকে সাইনবোর্ডে বানানটি ভুল করে Kinder Garden লেখেন। লেখুকগা।
পৃথিবীর সব দেশেই একই নাম, একই ধরণের কারিকুলাম। শুধু ফ্রান্স আর ইটালিতে বলে মেটারনাল স্কুল। এই তফাৎ। বাংলাদেশে সংক্ষেপে বলে কেজি। কিলোগ্রাম এর কেজি না, Kinder Garten এর প্রথম অক্ষর নিয়ে KG। অনেকে নার্সারি র সাথে গুলিয়ে ফেলে। ৩ থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুদের জন্য প্রি-স্কুল শিক্ষা বলতে পারেন। ৬ বছর বয়সে প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ওয়ান।
(২) জাপানিজ ভাষায় কিন্ডারগার্টেন কে বলে য়চিএন। “য়চি" মানে কচি-বাচ্চা, “এন" মানে বাগান বা পার্ক। কচি বাচ্চাদের বাগান। আমি বলি মানুষ তৈরির বাগান।
জাপানে আমার প্রথম কিন্ডারগার্টেন দেখার সুযোগ হয় ১৯৯০ সালে। আমাদের কয়েকজন বিদেশিদের দাওয়াৎ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। ওদের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হচ্ছিল। এ ধরণের অনুষ্ঠানে আমরা প্রায়ই অতিথি হয়ে যেতাম। আমাদের কাজ ছিল রিলে রেইস এর প্রতিযোগিতায় ওদের টিমে ঢুকে গিয়ে লড়াই করা। প্রত্যেক টিমে একজন করে বিদেশী। তারপর একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া। মাঝে মাঝে গান নাচ এ অংশ নেয়া। নিজের দেশ কেমন সে নিয়ে বক্তৃতা দেয়া। এই কাজের জন্য আমাদের ৫০ ডলারের মত টাকাও দিতো।
প্রথম প্রথম অতিথি ভাব নিয়ে যেতাম। জায়গায় জায়গায় ভুল ধরা যেন আমার দায়িত্ব। তখন জাপানে বিদেশি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম এর প্রস্তুতি চলছিল। স্কুলে বিভিন্ন দেশের পতাকা (কাগজে প্রিন্ট করা) রশি দিয়ে বেঁধে একটা আন্তর্জাতিক আন্তর্জাতিক ভাব আনার চেষ্টা করতো। বাংলাদেশের পতাকা কেন নেই, ওনারা কি বাংলাদেশকে দেশ মনে করে না- এই ধরণের চিকন টাইপের কমেন্ট করে বেচারাদের বিপদে ফেলে দিতাম। নিজের জ্ঞান বুদ্ধি কতটা অপরিপক্ব ছিল তা যখন বুঝতে পেরেছি - তখন আফসোস করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার এক জাপানি শিক্ষক বলেছিলেন - অতীতের কাজ নিয়ে কখনো আফসোস করবেনা। ধরে নেবে ঐ অভিজ্ঞতা টুকু না থাকলে আজ নিজের ভুল বুঝতে পারতে না।
জিজ্ঞাস করলাম এই যে আমাদের বিদেশিদের পয়সা দিয়ে ওদের অনুষ্ঠানে নিয়ে যাচ্ছে এতে তাঁদের লাভ কি? উনি বিশাল বক্তৃতা দিলেন-
“জাপান একটা দ্বীপ। অন্যান্য দেশের সাথে কোন বাউন্ডারি নেই। বিদেশি বলতে কি বোঝায় আমরা জানিনা। এখন থেকে জাপানে জনসংখ্যা কমবে। বিদেশ থেকে লোকজন আনতে হবে। একই কমিউনিটিতে বসবাস করতে হবে। এখনকার বাচ্চারা ২০ বছর পর সমাজে চাকুরী বাকুরি করবে। বিদেশিদের সাথে মিশবে। মানুষের সাথে মিশতে পারাটা ও একটা স্কিল। এক সঙ্গে খেলাধুলা করলে খাওয়া দাওয়া করলে কে কি ভাবছে তা বোঝা যায়। এখন থেকেই সেই প্রাকটিসটা হয়ে যাক। "
এই কথা ১৯৯০ সালের।
-এই বয়সের শিশুরা এগুলোর কী বুঝবে?
স্যার আবার দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন ।
"জন্ম এবং ৫ বছর বয়সের মধ্যবর্তী সময়কাল মস্তিষ্ক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় এবং এই সময়ে মস্তিষ্কে যে পথগুলি নির্ধারিত হয়, বাকী জীবনে তা প্রভাব ফেলে। বিদেশী বলতে রঙ ভিন্ন, ভাষা ভিন্ন, আচরণ ভিন্ন। কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ সেটা সে লজিক দিয়ে ১৮ বছর বয়স এর পর সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু ভিন্নতা আছে, ভিন্নতার মধ্যে সুন্দরতা আছে -এটা টের পাবার মোক্ষম সময় এটাই।...”
এতো বিশাল বক্তৃতা আমার মাথায় কিছু ঢুকেনি। তখনকার ডায়েরি দেখে বুঝলাম - প্রথম জাপানি ভাষায় যাকে প্রেমপত্র লিখেছিলাম, তাঁর সাথে এই কিন্ডারগার্টেনেই দেখা হয়েছিল।
মেয়েটির নাম রিএ। সে একটা ভোকেশনাল কলেজে পড়তো। তাঁর পড়াশুনার বিষয়বস্তু ছিল বাচ্চাদের জন্য খেলাধুলার সামগ্রী বানানো। সে এক খেলনা নিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছিল। অনেকটা আমাদের দেশের পুতুল নাচের মত। এতো গুলো মুভমেন্ট মাত্র তিনটি আঙ্গুল দিয়ে করে। তাঁর প্রতি ইম্প্রেসড হবার দ্বিতীয় কারণটি (প্রথম কারণটি তোলা রইলো) ছিল তাঁর এই আঙ্গুলের মুভমেন্ট। আমি সুযোগ পেয়ে তাকে একটা যাদু দেখিয়েছিলাম। সে দেখাল কাগজের খেলাধুলা। কাগজ ভাজ করে অরিগামি বানানো, কাগজ কেটে কেটে বিভিন্ন পশু পাখির আকৃতি বানানো। এসব নাকি তাঁর পড়াশুনার বিষয় বস্তু। বলে রাখি অরিগামি কিরিগামি এগুলো জাপানি আবিষ্কার। জ্যামিতি কে কি সুন্দর ভাবে কাজে লাগিয়েছে। কাগজ ভাজ করা, কাগজ কাটা একটা সায়েন্স। এখন বিশাল ব্যবসা।
সে আমাকে কিছু কাগজ গিফট হিসাবে দিল। আমি ডরমিটরিতে ফিরে দেখি - একটা কাগজে তাঁর নাম, ঠিকানা আর ফোন নম্বর দেয়া। সাথে দুইটা লাভ মার্ক। ঐ সময় ইমেইল আসেনি, ইন্টারনেট আসেনি, মোবাইল আসেনি, ফেসবুক ও ছিলনা। আমি আপ্লুত পুলকিত হয়ে জাপানি ভাষায় বিশাল এক প্রেমপত্র লিখলাম।
আমার জাপানি বন্ধুকে দেখালাম, জাপানি ভাষা ফিক্স করে দেয়ার জন্য। সে এই চিঠি পড়ে হাসি থামাতে পারছে না। বলছে এসব কি লিখেছ - চাঁদ তাঁরা এসব কোত্থেকে এলো? শুনে আমারই কাতঁকুঁতো লাগছে। চিরকুটটা দেখে বলল - এইসব লাভ-মার্ক প্রত্যেক মেয়েই দেয়। এখনকার স্টাইল। তাঁর হৃদয় দুলিত হয়েছে এমন কোন চিহ্ন এখানে নেই। আমি ভাবলাম - সে ঈর্ষান্নিত হয়ে আমাকে নিরুৎসাহিত করছে। আমি সুন্দর ঘ্রাণ ওয়ালা খামে করে চিঠি পোস্ট করে দিলাম। এক সপ্তাহের মধ্যে চিঠির উত্তর এলো। সেই চিঠি নিয়ে চলে গেলাম আমার চিঠি পড়ার নির্দিস্ট জায়গায়। টিলার চুড়ায়। দুইলাইনের সারাংশটি হলো - "ঠিকানার কাগজটি তাহলে তোমার কাছে চলে গিয়েছিল, আমি তো কিন্ডারগার্টেনের প্রিন্সিপাল কে দেয়ার জন্য লিখেছিলাম"।
কিন্ডারগার্টেন ডিজাইন করার জন্য স্পেশাল আর্কিটেক্ট আছেন।
এইবার শুনুন কেন জাপানি কিন্ডারগার্টেন পৃথিবীর শীর্ষে।
(১) অতি সাধারণ পরিবেশ- শ্রেণিকক্ষগুলো একেবারেই সিম্পল। বিলাসিতা নেই। যা দরকার যতটুকু দরকার ততটুকুই আছে। খেলনাগুলি কেমন জানেন? কার্ডবোর্ড, কাগজ, সংবাদপত্র দিয়ে তৈরি। আর আছে হরেক রকম বই। জাপানি ভাষায় লেখা। ছবিতে ভর্তি। খেলাধুলার বিষয়বস্তু, বইয়ে ছবির রঙ এর ব্যবহার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ক্রমাগত গবেষণা চলে।
(২) নিজের কাজ নিজে করো পলিসি - বাচ্চাদের নিজস্ব ব্যাগ থাকে। নীতিটি হ'ল শিশুবেলা থেকেই নিজের ব্যাগ নিজেকে গোছাতে হবে। এতে দায়বদ্ধতাবোধ এবং কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা বিকাশ হয়। নিজের পোশাক নিজেই পরিবর্তন করতে শিখে এবং করে। চিন্তা করুণ মাত্র ৩-৫ বছর বয়স।
(৩) পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো- অনেক বাবা-মা যদিও কমপ্লেইন করেন। শীতকালে ও এদেরকে শর্টস পরায়। শীতে নাকমুখ পা লাল হয়ে যায়- তারপর ও মাঝে মাঝে শীতকে উপভোগ করা শিখায়- এইভাবে প্রশিক্ষিত হয়ে উঠলে এদের শরীর নাকি এনভায়রন্টমেন্টফ্রেন্ডলি হয়ে ওঠে এবং ঠান্ডা ধরার সম্ভাবনা কম থাকে।
(৪) কল্পনা শক্তির বিকাশ- কিন্ডারগার্টেনে সমাজ, ইংরেজি, গণিতের মতো কোন পাঠ্যপুস্তক নেই। আছে শুধু গল্পের বই। যা শুনে মগজে কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে।
(৫) কননিচিওয়া, আরিগাতো আর গোমেননাসাই- শিশুকাল থেকেই প্রথম এই তিনটি শব্দ শেখাবে এবং প্রয়োগ করাবে। মানুষ মাত্রই দিনের প্রথম সাক্ষাতে শুভেচ্ছা জানাবে (কননিচিওয়া)। মানুষ মাত্রই কেউ কাউকে বিপদে সাহায্য করবে। সাহায্য পেলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে (আরিগাতো) আর মানুষ মাত্রই ভুল করবে, সেই ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবে (গোমেননাসাই)। এই তিনটি শব্দ যে কত বড় !!
(৬) জীবনের উৎস বোঝানো-প্রত্যেক শিশুর জন্মদিন পালন করা হয়। মাসে একবার। সেই মাসে জন্মগ্রহণ কারি সব শিশুদের। বাবা মা দাদা দাদি নানা নানীর জন্মদিনে ছবি একে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করানো শেখাবে।
(৭) গ্রুপ ওয়ার্ক- খেলাধুলা, রুম গোছানো, রুম পরিস্কার করা, খাবার বিতরণ করা, সব সব গ্রুপে গ্রুপে করে। সব কাজ গুরুত্ব পূর্ণ। কোন কাজই ছোট নয়।
(৮) ট্যুর - প্রত্যেক মাসেই ট্যুর এর আয়োজন করে। হেঁটে ট্যুর, গাড়িতে ট্যুর। নিজের মহল্লাতেই। যেমন গাড়ি চেনাবে। কোন গাড়ি সমাজের কি উপকারে লাগে - পুলিশের গাড়ি, ফায়ার সার্ভিস এর গাড়ি, অ্যাম্বুল্যান্স। বিভিন্ন পেশা শেখাবে- শিক্ষক, ছাত্র, শেফ, ড্রাইভার, নাপিত। যাঁদের অবদানে এই সমাজ টিকে আছে।
(৯) দিবস উদযাপন - জাপানি কিছু উৎসব আছে। হিনামাতসুরি, শিচিগোসান, অবোন। এসব উৎসব গুলো আনন্দ সহকারে পালন করা হয়। বাচ্চাদের দিয়ে গান গাওয়ানো, নাটক করানো - কত সুন্দর ভাবে যে ওরা শেখে আর পালন করে। শিক্ষকদের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে।
(১০) শিক্ষক - সবচেয়ে বড় অবদান আমি বলবো শিক্ষকদের। এই শিক্ষকরা সাধারণত কম বয়সী মেয়েরা হয়ে থাকে। বাচ্চারা তাঁদের কি যে ভালো বাসে।
কিন্ডারগার্ডেন এর শিক্ষকদের কথা বললেই আমার জাপানি ভাষার প্রথম প্রেমপত্র লেখা “রিএ" এর কথা মনে পড়ে। এমন গুণ সম্পন্ন মেয়েগুলোই শিক্ষক হয়। শিক্ষকরা যেমন বাচ্চা পছন্দ করে। শিশুরা ও তেমন শিক্ষকদের সন্মান করে। উইন উইন সিচুয়েশন।
জ্বি শিশুরা কি পছন্দ করে কি অপছন্দ করে। কি দেখলে আকৃষ্ট হয়। কি ভঙ্গি তাঁদের পছন্দ। শিশুদের কোন ভঙ্গি কি অর্থ বহন করে এগুলো গবেষণার বিষয়। ভোকেশনাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় গুলো তে পড়ানো হয়। জাপানি কার্টুনগুলো কেন এতো জনপ্রিয় তাঁর কারণ কেবলমাত্র কার্টুনের কাহিনি গুলো নয়। রঙ, আকৃতি, কণ্ঠ, চুলের ডিজাইন, চোখ-মুখ-নাক এর গঠন সব সব মিলিয়ে এই শিশু-প্রিয়তা।
গবেষণার ফসলগুলোর ব্যবহার এই কিন্ডারগার্টেনে হয়। কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা এইসব বিষয় নিয়ে ডিগ্রি পেয়ে বের হওয়া লাইসেন্সধারি প্রফেশনাল।
#collected
Shahalal Badsha
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Tanver Hassan
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
MD Abu Tayab
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
md sazzad hossain badsha
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
MD Alamin
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
rana hosen
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Riyan Ahmed
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Shakil adnan
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Nahid Biswas
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?