ঢাকায় যখন প্রথম আসি কোন এক বিকালে
শান্তি নগর মোড়ের টুইন টাওয়ার এর সামনে দাড়িয়ে আছি শান্তিনগর মোড়ে এই লাল বিল্ডিংটার সামনে যতবার দাড়াই আমি, ততবারই বিল্ডিংয়ের তলা গুনি । প্রত্যেকবারই নয় তলা পাই। হিসেবে কোন ভুল নেই, তবু গুনি। কেন গুনি জানি না।

গেটের দারোয়ান সালাম দিয়ে গেট খুলে দিল। বিরাট গোফ তার, জাঁদরেল চেহারা। এই দারোয়ানই শুরুর দিনে আমাকে ঢুকতে দিতে চায় নি। লোকটার অবশ্য দোষ ছিল না। আমার যে ড্রেস পরা ছিল তাতে ঢুকতে না দেয়াটাই স্বাভাবিক। এখন এই টিউশানি থাকলে আগের দিন যে করেই হোক শার্ট ইস্ত্রি করিয়ে রাখি । আমার রুমমেটের ইস্ত্রি আছে। ওকে বললেই ধার দেয়। ইস্ত্রির জন্য আলাদা কোন টাকা লাগে না ।
.
আমি লিফটে উঠলাম। উপরে উঠার সময় লিফট একটা ধাক্কা দেয়। উপরের দিকে একটা ত্বরণের কারণে।
প্রথম যেদিন লিফটে উঠি, ধাক্কার চোটে পড়ে গিয়েছিলাম। কোন এক শুক্রবার ছিল সেদিন। শাইখের সাথে বসুন্ধরা সিটি গিয়েছিলাম। আমি যেতে চাই নি। শাইখ জোর করে নিয়ে গেছিলো।
লিফটের লোকজন খুব হাসাহাসি করছিলো সেদিন । প্রচণ্ড লজ্জা পেয়েছিলাম। বেচারা শাইখও লজ্জা পেয়েছিলো। বাকি সময়টা শক্ত করে আমাকে ধরে রেখেছিল সে। এই নিষ্ঠুর নগরীতে যে কয়জন ভালো মানুষ দেখেছি, তাদের মধ্যে শাইখ একজন।

লিফট খুললে বাইরে বেরিয়ে এলাম। সাত তলা, লিফটের ছয়। দুপাশে দুটা ফ্ল্যাট। টবভর্তি কতগুলো গাছ। সূর্যের আলো ছাড়া এগুলো বাচে কিভাবে কে জানে। লাল পাতা ওয়ালা একটা গাছ আমার খুবই প্রিয়। এখানে আসলেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে গাছটা দেখি আমি। আমার যখন অনেক টাকা হবে বারান্দার ব্যালকনিতে এমন একটা গাছের টব রাখবো । দাম কত গাছটার কে জানে। ফুল টুল হয় কিনা তাও জানি না । গাছের একটা পাতা ছিড়ে রূমনকে দেখালে সে সব বলে দিতে পারতো। বোটানির স্টুডেন্ট রূমন। এমন কোন গাছ নাই যার কথা সে জানে না। কিন্তু এখানে পাতা ছেড়া যাবে না। সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে।

কলিংবেল টিপলাম। কাজের বুয়া দরজা খুলে দিল। ভিতরে ঢুকতেই ঠাণ্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে এলো। এদের প্রত্যেকটা রুমে এসি লাগানো। টাকা পয়সা হলে একটা এসি কিনতে হবে। আর একটা প্লাজমা টিভি ।

বসে থাকার ঠিক বিশ মিনিট পরে জারিন এলো। এতোক্ষণ কি করছিলো মেয়েটা? টকটকে লাল ড্রেস পরেছে সে। দেখতে বেশ ভালো লাগছে। বাসার মধ্যেও কি সেজেগুজে থাকে? নাকি এতোক্ষণ ধরে সাজলো?
কড়া পারফিউমের গন্ধে রুম মৌ মৌ করছে। বাসার মধ্যে এতো পারফিউম দেয়ার দরকার টা কি?
"কেমন আছেন, স্যার? "
মাথা দুলিয়ে হেসে হেসে বললো সে।
বড্ড ঢং করতে পারে এই মেয়ে। মাথার একপাশে চুল বিদঘুটে লাল করে রেখেছে। এটা নাকি আজকালকার ট্রেন্ড।
"আছি মোটামুটি। অংকগুলো করেছো? "
মুখে চাপা একটা হাসি নিয়ে ডানে বামে মাথা নাড়ালো সে। অনেকক্ষণ ধরে।

খুব বিরক্ত হলাম আমি। তিনদিন ধরে একই অংক করতে দিয়েছি। এখনো করে নাই। ভালোমতো থাপড়ানো দরকার। মনে মনে ভাবলাম আমি।
.
কিন্তু একে থাপড়ানো যাবে না। বকা পর্যন্ত দেয়া যাবে না। বড়লোকের একমাত্র মেয়ে। বকা দিলেই চাকরি শেষ! আন্টি প্রথম দিনই বলে দিয়েছেন, আমার মেয়েকে কোন বকা দেয়া যাবে না। বুঝিয়ে শুনিয়ে পড়াতে হবে।
তাই ইচ্ছে হলেও বকা দেয়া যাবে না। এই টিউশনিটা আমার ভীষণ দরকার। ভীষণ । এখানে বেতন ভালো। এদের বাসায় এসি আছে। মেস থেকে বেশি দূরেও না। তাছাড়া বিকেলে বেশ ভালো নাস্তা দেয়। যেদিন বিকেলে এখানে টিউশনি থাকে, দুপুরে কিছু খাই না আমি। দুপুরের খাবারের টাকাটা বেচে যায়।

জারিনকে নতুন চ্যাপ্টারের ম্যাথ বুঝিয়ে দিচ্ছি। বোঝানোর মাঝখানে সে বলে উঠলো, 'স্যার, আপনার শার্টটা খুব সুন্দর!'

লজ্জা পেলাম আমি। এই নিয়ে সে তিনদিন কথাটা বললো। টিটকারি করছে নাকি? আমার ভালো শার্ট মাত্র দুটো। এখানে আসলে এই দুটোর একটা পরে আসি । এই লাল শার্ট পরা অবস্থায় জারিন আরো দুইদিন একই কথা বলেছে।
সূত্র বুঝিয়ে জারিনকে কিছু অংক করতে দিলাম।

ঢং ঢং করে পাঁচটা বাজলো। জারিনদের দেয়াল ঘড়িতে।

যখন বাবা বেচে ছিলেন, আমাদেরো একটা দেয়াল ঘড়ি ছিল
একঘণ্টা হয়ে গেলো। নাস্তা দিচ্ছে না কেন এরা? অন্যদিন তো শুরুতেই দেয়।
আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরেই কিনা জানি না জারিন বলে উঠলো, 'আজকে কাজের বুয়া আসে নি। তাই নাস্তা দিতে পারলাম না। স্যরি ভাইয়া। '
একটু ম্লান হাসলাম আমি। মনটা অনেক খারাপ হয়ে এলো। পকেটে আছে আর মাত্র ১০ টাকা। এই টাকা দিয়ে কি খাবো? কালকে চলবো কিভাবে?

.
কলিংবেল বাজলো। আন্টি এসেছেন। দরজার ফাঁকে তাকিয়ে আমাকে বললেন রাহুল, পড়ানো শেষ করে একটু বসো। কথা আছে। '
'জ্বি আচ্ছা, আন্টি।'

নতুন চ্যাপ্টারের পড়া শেষ হতেই জারিন বললো, ভাইয়া একটা প্রশ্ন করতে পারি?
'করো। '
'প্যারালাল ইউনিভার্স জিনিসটা কি?'
যতটুকু সম্ভব ওকে বুঝিয়ে বললাম।
একটা দীর্ঘশ্বাস নেমে এলো। এই হাইপোথিসিস অনুযায়ী, বহু বহু দূরে কোন পৃথিবীতে এমন আরেকটা আমি আছি।
সেই আমিও কি এমন নি:স্ব?
সেই আমিও কি দুপুরের খাবারের টাকা বাচানোর জন্য স্টুডেন্টের বাসায় নাস্তার আশায় বসে থাকি?

জারিন চলে গেল। কিছু হোমওয়ারক দিয়েছি তাকে। জানি করবে না, তবুও দেয়া।

আরো আধা ঘণ্টা বসে থাকলাম। তারপর আন্টি এলেন। চেহারায় কেমন যেন রাগ। কড়া গলায় কথা বলতে লাগলেন তিনি। কারণটা ঠিক বুঝতে পারলাম না।
'নতুন মাসে তুমি কয়দিন এসেছো?'
'জ্বি, দুইদিন আন্টি'
'দুইদিনের টাকাটা আগামী সপ্তাহে এসে নিয়ে যেও। '
'জি আন্টি???'

ধ্বক করে উঠলো আমার বুকের ভেতরটা।
'বুঝতে পারছো না তো?' আন্টির কন্ঠে উপহাস।
লাল রংের একটা ডায়েরি আমার সামনে ছুড়ে ফেললেন তিনি।
'দেখো এটা।'

কাপা কাপা হাতে ডায়েরিটা নিলাম। আমার ভিতরে তখন ঝড় চলছে। এই টিউশনি না থাকলে খাবো কি? বাসায় টাকা পাঠাবো কি করে?

ডায়েরি খুলে দেখি জারিনের হাতের লেখা। প্রথম চারটা পৃষ্ঠা জুড়ে একই কথা বারবার লিখা
'রাহুল স্যারকে ভালো লাগে। রাহুল স্যারকে ভালো লাগে। রাহুল স্যারকে ভালো লাগে।
রাহুল স্যারকে ভালো লাগে....।'
২-৩ টা পৃষ্ঠায় কিছু অদ্ভুত চিণ্হ। বাকি পৃষ্ঠাগুলো খালি।

ডায়েরি টা দেখে আমার গলা শুকিয়ে এলো। গুরুতর অপরাধ।

যদিও আমি এর কিছুই জানি না।

'তোমার মত একটা চালচুলোহীন ছেলে আমার মেয়ের মাথা খেয়ে বসে আছে। চিন্তা করা যায়!'
বিরক্তি এবং রাগের সাথে কথাগুলো বললেন আন্টি।

আমি কিছু বলতে পারলাম না। আন্টির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। আমার দিকে বিষদৃষ্টি দিয়ে আন্টি ভিতরে চলে গেলেন।
.
.
লিফটে নামার সময় আমার প্রচণ্ড ভয় হতে লাগলো। সামনের দিনগুলি কিভাবে কাটবে আমার? বাবুর (আমার ছোট বোন) লেখাপড়ার খরচ দেবো কিভাবে? আরেকটা টিউশনি কোথায় পাবো?
.
নিচে নেমে দেখি সন্ধ্যা হয়ে গেছে। খুব অল্প বৃষ্টি হচ্ছে। দূরে কোথাও আজান দিচ্ছে। মানুষজন, রিকশা - গাড়ি অনেক কম। সমস্ত শহরে একটা অদ্ভুত নিরবতা।
হঠাৎ আমার মন থেকে সব ভয় দূর হয়ে গেলো। আমি রমনাপার্কএর দিকে হাটতে লাগলাম।
একটা খোড়া ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইতে আসলো। 'স্যার দুইডা ট্যাহা দেন, সারাদিন কিছু খাই নাই। ' পকেট থেকে বের করে দশ টাকা দিয়ে দিলাম আমি।
.

বৃষ্টি বাড়ছে।
সেই সাথে ঝড় শুরু হয়েছে।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা। লোকজন যে যেখানে পারছে আশ্রয় নিচ্ছে।

সোডিয়াম ল্যাম্পের হলদে আলোয় আমি হেঁটে চলেছি।
আমার কোন তাড়া নেই।
হাঁটতে ভীষণ ভালো লাগছে।

সহজ এফিলিয়েট

ঘরে বসে সহজ আয়

ফেসবুক চালাতে পারলেই আয় করতে পারবেন

এখনি শুরু করুন