মুক্তিযুদ্ধ- ২য় পর্ব
আমি আমতা আমতা করে বলি, ঘটনা তো অন্য রকমও হতে পারে মেশকাত।
“কী রকম?”
একাত্তরে শুধু মুক্তিযোদ্ধারা গুলি খেয়েছেন তা কিন্তু নয়, অন্য পক্ষও----
আমার কথা হাতের ঝাপটায় থামিয়ে দিয়ে মেশকাত বললো, বুঝেছি, আপনি বলতে চাইছেন, লোকটি রাজাকারও হতে পারে তাই না?
হা, আমি তাই বলতে চাইছি।
না, ভাই, তাঁর রাজাকার হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। আমরা তাঁর শরীরে পাওয়া বুলেটটি পুলিশের ফরেনসিক বিভাগে পাঠিয়েছি। জানেনই তো পেশাগত কারণে ওদের সাথে আমাদের সম্পর্ক খুব ভাল। তাঁরা জানিয়েছেন বুলেটটি ‘ড্রাগোনোভ’ স্নাইপার রাইফেলের। পাক বাহিনীর খুব হাই প্রোফাইল সৈনিকেরাই কেবল এ রাইফেলগুলো ব্যবহার করতো। যেমন ধরুন খুব উচ্চ পদস্থ কারো দেহরক্ষীরা। এ রাইফেল মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাই আমি নিশ্চিত ভদ্রলোক মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার নন।
আমি তার যুক্তি মেনে নিয়ে বলি, কিন্তু এখানে আমার কাজ কী?
“ ভাই, আমি তো বলেছি লাশটিকে ফ্যামিলির কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই।“
সেটা কীভাবে সম্ভব?
“সে জন্যই তো আপনাকে ডাকা। ড্রাগোনাভ রাইফেলের গুলি ব্যবহৃত হয়েছে মানে ভদ্রলোক কোন ব্যতিক্রমধর্মী লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন।। মাঠেঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক বাহিনির যে অসংখ্য সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছে, সম্ভবত এটা সে রকম নয় । এটা খুব সম্ভব কোন উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিকে আক্রমণ করার জন্য পরিচালিত অভিযান, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহরক্ষীরা স্নাইপার রাইফেলের গুলি ছুড়েছিল। আপনার তো অনেক ‘একাত্তর’ বিশেষজ্ঞের সাথে পরিচয় আছে, আপনি কি তাঁদের জিজ্ঞেস করতে পারেন, সে রকম কোন ঘটনা ঘটেছিল কিনা? যদি ঘটে সে অভিযানের কেউ বেঁচে আছেন কিনা? যদি থাকেন, তাহলে হয়তো তিনি এ ভদ্রলোককে চিনতেও পারেন।তাঁরা হয়তো সহযোদ্ধা ছিলেন।“
এটা কি সম্ভব? আমি অনিশ্চিত গলায় বললাম।
“ বাদল ভাই, চেষ্টা করতে সমস্যা কী? একটা সূত্র যেহেতু আছে, আমরা ট্রাই করে দেখতে পারি। আমরা তো অন্তত এটা জানি যে, ড্রাগোনোভ রাইফেল শুধু হাই প্রোফাইল দায়িত্বে থাকা সৈনিকেরা ব্যবহার করতো। তাদের সাথে তো খন্ড যুদ্ধ খুব বেশি হওয়ার কথা না। আপনি চেষ্টা করুন। আমার মনে হয় সিরিয়াসলি খুঁজলে এরকম মুখোমুখি যুদ্ধের খবর বের করা যাবে। তবে সময় বেশি নেই। আমি হাসপাতাল থেকে পাঁচ দিন সময় নিতে পেরেছি। এরপর লাশটি আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামকে দিয়ে দেয়া হবে। ভদ্রলোকের ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। মাজারে অনেকেই তাঁকে নামাজ পড়তে দেখেছেন।ইন ফ্যাক্ট তাঁরাই পুলিশকে তাঁর মৃত্যুর খবর দেন।
আমি কোন ধরণের সাহায্য করতে পারবো বলে মেশকাতকে আশ্বস্ত করতে পারলাম না। তবে চেষ্টা করার কথা দিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। প্রথমেই ফোন করলাম ইসমাইল মজুমদারকে।তিনি বয়সে আমার বছর পাঁচেকের বড়। ভদ্রলোককে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চলন্ত এন্সাইক্লোপেডিয়া বলা যায়। গত প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তিনি সারা দেশ ঘুরে ঘুরে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। এ বিষয়ে তাঁর লেখা বইকে মোস্ট অথেনটিক বিবেচনা করা হয়। চট্টগ্রামের বধ্যভূমি নিয়ে কাজ করার সময় তাঁর সাথে আমার পরিচয়।তারপর ঘনিষ্টতা। আমরা পরে এক সাথে কিছু কাজও করেছি।
তিনি আমার প্রশ্নের সাথে সাথে উত্তর দিলেন, বাদল, তোমার ডাক্তার বন্ধু ঠিকই বলেছেন। এ রাশিয়ান রাইফেল পাকিস্তানীদের হাতে আসে একাত্তরের অক্টোবরের পর। যদিও কীভাবে এটা তারা পেলো তা পরিস্কার নয়। তখনকার পরিস্থতিতে রাশিয়ার তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করার কথা নয়। সম্ভবত তারা এটি সংগ্রহ করেছিল থার্ড পার্টির মাধ্যমে। এরকম থার্ড পার্টি অস্ত্র বিক্রি খুব কমন একটি ব্যাপার। যাই হোক, অক্টোবরে ঢাকায় রাইফেলগুলো আনা হয় উচ্চ পদস্থ পাকি বদমাশ আর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার কাজে দায়িত্ব প্রাপ্ত কমান্ডোদের ব্যবহারের জন্য। ঢাকার বাইরে এগুলোর ব্যবহার তেমন হয়নি। তবে আমি ঠিক জানি না কোন খন্ড যুদ্ধে এটা ব্যবহৃত হয়েছি কিনা? আমাকে একদিন সময় দাও। খোঁজ নিয়ে দেখি।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গে ইসমাইল মজুমদারের ফোনে।তাঁকে বেশ উত্তেজিত মনে হয়, বাদল,শুন, একটা পাত্তা মনে হয় পাওয়া গেছে----
তাঁর উত্তেজনা আমাকেও টানটান করে তোলে, কী পাত্তা ভাইজান?
‘তুমি তো ক্রাক প্লাটুনের কথা জানো তাই না? একাত্তরে খালেদ মোশাররফের উদ্যোগে ১৭ জনের একটি ছোট্ট গেরিলা ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছিল-------“
আমি কিছুটা বিরক্তি নিয়ে তাঁকে থামিয়ে দেই, আমি এ ব্যাপারে ভালভাবে জানি ভাইজান। ওই সময় জুন মাসে গঠিত দলটা কর্ণেল হায়দারের নেতৃত্বে ঢাকায় ঢুকে গেরিলা অপারেশন শুরু করে। কিন্তু এর সাথে আমাদের মৃত ভদ্রলোকের সম্পর্ক কী? তিনি কি এ প্লাটুনের সদস্য ছিলেন? তাও তো সম্ভব না, কারণ ক্রাক প্লাটুনের কার্যক্রম আগস্ট মাসে এর উল্লেখযোগ্য সদস্যরা ধরা পড়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় পাক বাহিনীর হাতে নিহত হন শহীদ রুমি, বদিউল আলমসহ আরো অনেকে, আর আমাদের ভদ্রলোক সম্ভত গুলি খেয়েছিলেন অক্টোবরের পর। কারণ ড্রাগোনোভ রাইফেল এর আগে পাক বাহিনীর হাতে ছিলো না---
“আরে থামো তো মিয়া”- এবার ইসমাইল ভাই-ই আমাকে প্রায় ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এইখানেই তুমি ভুল করছো।“
কোথায় ভুল করছি ভাইজান?
“এই যে বললে আগস্টে ক্রাক প্লাটুনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়- আসলে এটা ঠিক না। সেপ্টেম্বরেই ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠা ফিনিক্স পাখির মতো ক্রাক প্লাটুন আবার আবির্ভুত হয়। এবার প্রথমে তাঁরা সংখ্যায় ছিলেন ত্রিশ জন।তারপর আরো অনেকেই তাঁদের সাথে যোগ দেন।“
আমি কিছুটা অসহিষ্ণু কন্ঠে বলি, ভাইজান, এর সাথে আমাদের ইস্যুর সম্পর্ক কী যদি পরিস্কার করতেন ভাল হতো।
“ একাত্তর সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিকে ক্রাক প্লাটুন ঢাকা রেডিও অফিস আক্রমণ করে। সেখানে সম্ভবত ড্রাগোনোভ রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছিল। কারণ তাঁদের সে অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল এবং সাতজন গেরিলা সদস্য নিহত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের আরকাইভ বলছে, তাঁরা সবাই নিহত হয়েছিলেন অনেক দূর থেকে ছোড়া গুলিতে। সম্ভবত পাক স্নাইপাররা রেডিও অফিসের ছাদ থেকে গুলি ছুড়েছিল। সে ক্ষেত্রে ড্রাগোনোভ রাইফেলই ছিল বদমাশদের একমাত্র ভরসা। তাদের কাছে আর কোন দূর পাল্লার রাইফেলের সাপ্লাই ছিলো না। তাই আমার মনে হচ্ছে আমাদের ভদ্রলোক হয়তো রেডিও অফিস আক্রমণে ছিলেন। সম্ভবত তিনি ক্রাক প্লাটুনের দ্বিতীয় পর্বে তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। পসিবলি হি ওয়াজ আ ইয়াং ফিনিক্স হু মেইড কামব্যাক ফর রিভেঞ্জ।“
চলবে....

সহজ এফিলিয়েট

ঘরে বসে সহজ আয়

ফেসবুক চালাতে পারলেই আয় করতে পারবেন

এখনি শুরু করুন