মুক্তিযুদ্ধ- প্রথম পর্ব
01.
"দুপুরে ঘুমানো আমার অনেক পুরানো অভ্যেস। যত ব্যস্তই থাকি না কেন, আধ ঘন্টা আমাকে ঘুমাতেই হবে। এ সময় টেলিফোনের রিসিভার তোলা থাকে, মোবাইল ফোন সাইলেন্ট করা থাকে। পর্দা টেনে ঘর অন্ধকার করা হয় ।মোটামুটি সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘ভাত ঘুম’ যাকে বলে।
সেদিন ও এ রকম ভাত ঘুম দিয়ে উঠেছি। তারপর হাত মুখ ধুয়ে মোবাইল চেক করে দেখি অনেকগুলো মিস কল। করেছে ডাক্তার মেশকাত। একটু অবাক হলাম। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এ ডাক্তারের সাথে আমার তেমন ঘনিষ্টতা নেই। মাঝে মাঝে সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা হলে সামান্য কথাবার্তা হয় মাত্র। সে কী প্রয়োজনে এত বার ফোন করেছে? ভাবতে ভাবতে কল ব্যাক করলাম।
ওপাশ থেকে মেশকাত সাড়া দিলো, ‘বাদল ভাই, সরি বিরক্ত করলাম বোধ হয়।‘
আমি বললাম, না, না, বলো কী ব্যাপার?
“ভাই আপনি কি একবার আমাদের হাসপাতালে আসতে পারবেন?”
এবার আমার আরো অবাক হওয়ার পালা। ওর হাসপাতালে আমার কী কাজ?ওরা মূলতঃ কাজ করে পোস্ট মর্টেম নিয়ে। এর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তারপর বুক ধ্বক করে উঠলো, তাহলে কি আমার পরিচিত কেউ মর্গে আছে?
আমি উদ্বেগ নিয়ে বললাম, মেশকাত, এনি থিং রং? পরিচিত কারো কোন সমস্যা হয়েছে ?
“ না, না, বাদল ভাই, একটা ব্যাপার একটু ইন্টেরেস্টিং মনে হচ্ছে। তাই আপনার সাথে আলাপ করতে চাইছি।“
কী ব্যাপারে মেশকাত?
“ গত রাতে আমাদের এখানে একটা লাশ এসেছে। সেটার ব্যাপারে কথা বলতে চাই।আপনি ভয় পাবেন না, এটা পরিচিত কারো লাশ নয়। কিন্তু ব্যাপারটা কেমন যেন ইন্টেরেস্টিং। মনে হচ্ছে আপনি পুরো বিষয়টা দেখলে কিছুটা ধারণা দিতে পারবেন, আসলে ব্যাপারটা কী?”
ওকে, আমি আসছি। সামনা সামনি কথা বলবো।
মেশকাতের অফিসে যখন পৌঁছালাম তখন শেষ বিকেল। এ সময় ওর অফিসে থাকার কথা না। দুপুরেই ওর অফিস শেষ। তারপরও সে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। মনে হচ্ছে সে যা বলতে চায়, তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
আমি ওর সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললাম, এবার বলো দেখি, আসলে কী ব্যাপার?
“ বাদল ভাই, আগে চা খান, তারপর বলি” বলে সে বেল টিপলো। সাথে সাথে একজন আর্দালী ট্রে হাতে চা নিয়ে ঢুকলো।মনে হয় আগেই বলা ছিল। তাই বেল টিপতেই চায়ের আগমন। আমি হাসতে হাসতে বললাম, মনে হচ্ছে তুমি বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে চাও- চা পর্যন্ত রেডি করে রেখেছো!
মেশকাত মৃদু হাসলো, তারপর বললো, বাদল ভাই, গত রাতে আমাদের এখানে একটি বেওয়ারিশ লাশ এসেছে। মিশকিন শাহের মাজারে মরে পড়েছিল। পুলিশ আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়। তাদের বেওয়ারিশ লাশের পোস্ট মর্টেম করে রেকর্ড রাখতে হয়। আমরা দেখলাম লোকটি মারা গেছে নিউমনিয়ায়। নাথিং এবনরমাল।ন্যাচারাল ডেথ।
আমি কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বললাম, এর সাথে আমার সম্পর্ক কী?
মেশকাত জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো, সেখানে নরম সন্ধ্যার আলো। কিছুক্ষণ সে দিকে তাকিয়ে থেকে সে মৃদু গলায় বললো, লাশের উরুতে একটি গুলি পাওয়া গেছে। সম্ভবত অপারেশন করা হয়েছিল, কিন্তু গুলিটি বের করা যায়নি------
আমি তাকে থামিয়ে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললাম, কিছু মনে করো না মেশকাত, ক্যান ইউ কাম টু দ্য বিজনেস? আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাকে কেন ডেকেছ তাও বুঝছি না।
মেশকাত কিছুটা ঝুঁকে এসে বললো, বাদল ভাই, আমাদের রিপোর্ট বলছে গুলিটির বয়স প্রায় আট চল্লিশ বছর।
তো? আমি প্রশ্ন করলাম।
এবার মেশকাতই কিছুটা অসহিষ্ণু গলায় বললো, ভাই, আট চল্লিশ বছরের পুরানো গুলির মানে বুঝতে পারছেন?
সরি, মেশকাত, পারছি না।
“ আট চল্লিশ বছর আগে মানে উনিশ শ একাত্তর সাল, বাদল ভাই।“
এবার আমি নড়ে চড়ে বসলাম। তুমি কী বলতে চাইছো মেশকাত?
“ ভদ্রলোক মনে হয় একাত্তরে গুলি খেয়েছিলেন। সম্ভবত আজ সকালে মিশকিন শাহের মাজারে যে অসহায় মানুষটি নিঃসঙ্গ এবং অতি দরিদ্র অবস্থায় মারা গেছেন তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা---- বলতে বলতে সে সামনে ঝুঁকে আসে, তারপর দৃঢ় কন্ঠে বলে, বাদল ভাই, আপনি হয়তো জানেন না, একাত্তরের ২৭ আগষ্ট আমার বাবাকে আমাদের রেলওয়ে কলোনীর বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর আর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। হয়তো তিনিও এরকম বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে কোথাও পড়ে ছিলেন। কিন্তু ইনার ক্ষেত্রে আমি তা হতে দেবো না। আমি তাঁর ফ্যামিলিকে খুঁজে বের করে তাদের হাতে লাশ তুলে দেবো, যাতে অন্তত তিনি প্রিয়জনদের হাতে সমাহিত হন।
চলবে....

সহজ এফিলিয়েট

ঘরে বসে সহজ আয়

ফেসবুক চালাতে পারলেই আয় করতে পারবেন

এখনি শুরু করুন