মকবুল তার ডান হাতের তর্জনীটাকে চাপ দিয়ে ফুটালো। বাকিগুলো ইতোমধ্যে ফুটানো শেষ। আঙুল ফুটানো তার বহু দিনের অভ্যাস।
তার পাশে বসা সামিউল। গ্রামের বিশিষ্ট জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। মকবুল প্রায় দেড় বছর ধরে বেকার ঘুরছে। এই সময়টা সে সামিউলের পাশেই কাটিয়েছে। নানা জ্ঞান-উপদেশ লাভ করেছে। যদিও বেকারত্ব কাটাতে তা মোটেও কাজ করে নি।
সামিউল মহা আনন্দে চা খাচ্ছে। তার হাতে দুই পিস বিস্কিট আছে। বিশিষ্ট জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে চায়ের দোকানদার তাকে একটা বিস্কিটের সাথে আরেকটা দিয়ে দেয়। এর বদলের চায়ের দোকানদারের প্রতি সে মোটামুটি মোটিভেশনাল স্পিচ দিয়ে দেয়।
আজ সামিউলের মনে অনেক রকমের মোটিভেশনাল কথা বাজছে। মনে মনে সে ঠিক করে ফেলেছে আজ এমন সুন্দর সব কথা বলবে যাতে মকবুলের চাকরি-বাকরি করার ইচ্ছা ছেড়ে তার মত হয়ে ওঠার মানসিকতা গড়ে ওঠে।
প্রতিদিনের মত হালকা কেশে সামিউল বলা শুরু করল, “বুঝলি মকবুল দি মকি, এই দেশে চাকরির স্বপ্ন দেখতে দেখতে মানুষের কবরে যাওয়ার দিন চলে আসে। চাকরি হয় সব সিংগাপুর, মালয়শিয়া, অ্যামেরিকা, অস্টেলিয়ায়। সেইদিক যাইতে পারলে তখন তুই চিন্তা করবি চাকরির। এই দেশে তো এইরাম চা খাইয়েই দিন কাটাবিরে ভাই।”
মকবুলের চেহারায় বিভ্রান্তির ছাপ। সে বলল, “ভাই, সেজন্য তো সেরকম সুযোগও লাগে। বিদেশে যাইতে চায় না এরকম কেউ তো আর নাই। আমি সুযোগ পাইলে তো স্ট্রেট ফরোয়ার্ড যাইতাম চলে।”
চায়ের দোকানদারের চেহারা দেখে মনেই হচ্ছিল সে বিশাল কিছু বুঝে ফেলছে।
সামিউল বলল, “ভাইরে, পারলে কি আমি তোর জন্য সেই ব্যবস্থা করতাম না! নিজেই তো আটকা। তারপরও বলি, আমার মতই থাক। আনন্দে চা খা, ছোট ভাইদের মোটিভেট কর। ব্যস, জিন্দেগি সেট।”
এই আলোচনা বেশ দূর এগোতে লাগল। চায়ের দোকানদার গভীর মনোযোগে সব কিছু শুনতে, বুঝতে লাগল। বোঝাই যাচ্ছে প্রচণ্ড মোটিভেট হচ্ছে সে।
বিকালের দিকে চায়ের দোকানে আরেক মজলিশ বসল। মুরব্বিদের মজলিশ আর কি। সেখানে সবাই নানান বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলছে। তখন হঠাৎ চায়ের দোকানদার এক বাণী দিল, “সবাই জানেন তো মকবুল বিদেশ যাচ্ছে?”
মজলিশে মকবুলের বাবাও ছিল। তিনি অবাক হয়ে বললেন, “কী বল নুরু মিয়া? আমার ছেলে বিদেশ যাবে আর আমি জানি না। তুমি জানলা কই থেকে?”
“আরে চাচা আজ সকালেই জানলাম। সামিউল বলতেছিল সে ব্যবস্থা করবে।”
মকবুলের বাবা এবার বিশ্বাস করলেন। “তাইলে তো ভালো হলো। ছেলেটায় কদ্দিন ধরে খালি ঘুরে বেড়ায়, সামিউলের সাথে তো থাকে। তবে সামিউল কেমনে করল? সে নিজেই তো বেকার।”
“আরে চাচা, বেকার তো ইচ্ছায়। চাইলে সামিউলে অনেক করতে পারত।”
“তা ভুল বলো নাই। যাক, ছেলেয় তো আর বাড়ি আসে নাই। আসলে মনে হয় জানতে পারতাম আগেই।”
সারা মজলিশে একটা হালকা জোয়ার গেল। মকবুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাই নানান কথা বলতে লাগল। সামিউল অন্য কারো যেন উপকার করে সেসব বিষয় নিয়েও কথা চলল।
রাতের বেলায় মকবুল বাড়ি ফিরলে তার বাবা শুধু পিছপিছ ঘুরতে লাগছিল। মকবুল তো আর কিছু জানে-বোঝে না। মকবুলের বাবাই বারবার ঘুরে বেড়াচ্ছে।
খাওয়ার পর মকবুলের বাবা তাকে ডেকে বলল, “খুশির খবর সবার আগে পিতা-মাতা দেওয়ার নিয়ম। জানো তো?”
“জানব না কেন।”
“শুধু জান নাকি পালন করতে হয় তাও জান?”
“অবশ্যই আব্বা, খুশির খবর তো আপনাকেই আগে দিব।”
“কথা বুঝে শুনে বলবা। তুমি কি আমাকে বল সব?”
“কী বলি না আব্বা?”
“সামিউল যে তোমায় বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করল তা কি আমায় জানানো লাগবে না?”
“কী বলেন আব্বা? এই কথা কই শুনলেন?”
“নুরু মিয়া বলল। তোমায় নাকি বিদেশ পাঠায় দিবে।”
“এ খবর তো আমি জানি না। সত্যি নাকি?”
“কথা সত্য। সামিউল অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছেলে, শুধু নিজের দোষে কিছু করে না। তুমি তার মত না হও তাই চাচ্ছিলাম। কিন্তু তোমার একটা ব্যবস্থা যে সে করেই দিবে তাও ভাবতাম।”
“যাক আব্বা, আলহামদুলিল্লাহ বলি।”
এই নিয়ে সারারাত মকবুলের বাড়ি এবং সমগ্র গ্রামে বিস্তর আলাপ-আলোচনা চলল। ব্যাপারটা প্রায় বৃহৎ আকার ধারণ করল।
মকবুল তো বিশেষ প্রস্তুতি নিতে লাগল। সামিউল ভাই তাইলে যা বলল তাইই করল। তাকে মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ দিতে দিতে মকবুলের গোছানো চলল। এর মধ্যে বহু মানুষে এসে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, নানা কথা-বার্তা বলে গেল। শুধু সামিউলের খবর নাই। একজন আবার খবর দিল পরশুই নাকি ঢাকা যেতে হবে।
এভাবে সন্ধ্যা হলে মকবুল সামিউলের বাড়ির দিকে যেতে লাগল। বাড়ির বেশ দূর থেকেই মানুষের আনাগোনা। সবাইই সামিউলের সাথে বিদেশের লিঁয়াজু নিয়ে আসছে। মকবুল ভীড় ঠেলে সামিউলের ঘর পর্যন্ত পৌঁছাল। সামিউল পুরোপুরি হতভম্ভ ভঙ্গিতে সবাইকে কিছু বোঝাচ্ছে।
মকবুলকে দেখে সামিউল এগিয়ে এসে বলল, “কীসব কথা চলছে শুনতেছিস?”
“কী কথা ভাই?”
“আমি বাকি তোকে বিদেশ পাঠাচ্ছি। এই কথা কে বলছে?”
“আহ, কী যে বলেন। আপনার কথা আমি বলছি নাকি। সবাই আমাকে বলছে তো। আমি তো ধন্যবাদ দিতেই আসলাম। নুরু মিয়া জানাইছিল আব্বাকে।”
“কী বলিস গুছায়ে বল। কিছু বুঝি না।”
“আর ভাই ধন্যবাদ। বিদেশ পাঠানোর জন্য।”
“তোর মাথা গেছে। আমি তোরে কেমনে বিদেশ পাঠাবো? নিজেরই খানা নাই।”
“ভাই আপনার আর এই বলা লাগবে না। সবই তো বুঝি আমি।”
“তোর মাথা গেছে সত্যিই। কে যে এই ফাউ কথা ছড়াচ্ছে। তোরে বলছে কে?”
“আব্বা বলল, গ্রামের মানুষ সবাই।”
“সত্যি ভাই আমি কিছু জানি না। কই থেকে কে যে এই কথা ছড়াচ্ছে।”
চারপাশ দিয়ে সামিউলকে মানুষ ঘিরে ধরল। সবারই এক দাবি বিদেশ যাব, বিদেশ যাব।
Salman Foysal
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
জান্নাতুল মিম
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
Habibullah Mullah
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
MD Rayhanozzaman Shibly
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
kismot reza
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?
MD Shamim Khan
Delete Comment
Are you sure that you want to delete this comment ?