পত্রিকাঃ সমকাল-শৈলী
শিরোনামঃ অনুপম স্থাপত্য নিদর্শন আহসান মঞ্জিল
লেখাঃ তন্ময় হাসান সিয়াম
ছবিঃ আলামিন ও বাঙ্গালী ট্যুরিস্ট
https://epaper.samakal.com/nog....or-edition/2021-09-0

তৎকালীন ঢাকার নবাবদের আবাসিক বাসভবন, জমিদারির সদর কাচারি একসময় ছিল বাংলার প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র; বর্তমানে তা জাদুঘর হিসেবে পরিচিত এবং এর সম্মুখভাগে রয়েছে নান্দনিক ফুলের বাগান ও সবুজের ছোঁয়া। বলছি পুরান ঢাকার ইসলামপুরের কুমারটুলী মহল্লার বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন আহসান মঞ্জিলের কথা। ঢাকা শহরের ইট-পাথরের তৈরি প্রথম স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে এ স্থাপনাকেই ধরে নেওয়া হয়।

নবাব পরিবারের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাসাদটি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। প্রাসাদটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছে দীর্ঘ ১৩ বছর, অর্থাৎ ১৮৫৯ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হলেও শেষ হয় ১৮৭২ সালে। এই প্রাসাদটির প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব আবদুল গনি এবং তার ছেলে খাজা আহসান উল্লাহর নামানুসারে এর নামকরণ করেন আহসান মঞ্জিল। তখনকার সময়ে আহসান মঞ্জিল নির্মাণের আগের ভবনটি অন্দরমহল ও নির্মাণের পর রংমহল নামে পরিচিত ছিল।

এর ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জামালপুর পরগনার জমিদার শেখ ইনায়েত উল্লাহ রংমহল নামকরণে একটি প্রমোদ ভবন নির্মাণ করেন। পরে তার ছেলে শেখ মতিউল্লাহ রংমহলটি ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করে দেন। তাদের কাছে এটি বাণিজ্য কুঠি হিসেবে বেশ পরিচিত ছিল। অতঃপর ১৮৩০ সালে পুরান ঢাকার বেগমবাজারে বসবাসকারী নওয়াব আবদুল গনির বাবা খাজা আলীমুল্লাহ এটি ক্রয় করে সেখানে বাসস্থান স্থাপন করেন। পরে তার বাসভবনকে কেন্দ্র করে নওয়াব আবদুল গনি ইউরোপীয় নির্মাণ ও প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানিকে দিয়ে একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করান। যার প্রধান ইমারত ছিল আহসান মঞ্জিল।

১৯৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এই প্রাসাদটিকে জাদুঘর হিসেবে জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এক মিটার উঁচু বেদির ওপর নির্মিত দ্বিতল প্রাসাদ ভবনটির পরিমাপ উভয় পাশে যথাক্রমে ১২৫ দশমিক ৪ মিটার ও ২৮ দশমিক ৭৫ মিটার এবং ভূমি থেকে গম্বুজের শীর্ষের উচ্চতা ২৭ দশমিক ১৩ মিটার। প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় প্রবেশদ্বার। পাশাপাশি ওপরে ওঠার সিঁড়িগুলোও নজর কাড়ে যে কোনো দর্শনার্থীর। প্রাসাদটির প্রতিটি কক্ষ অষ্টকোণবিশিষ্ট এবং এর ভেতরের পূর্ব পাশে রয়েছে বৈঠকখানা, পাঠাগার ও নাচঘর। অন্যান্য আবাসিক কক্ষ রয়েছে পশ্চিম পাশে। তাছাড়া প্রাসাদের নিচতলায় রয়েছে দরবার গৃহ ও ভোজন কক্ষ। প্রাসাদের উভয় তলার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে অর্ধবৃত্তাকার খিলানবিশিষ্ট বারান্দা এবং এর মেঝে মার্বেল পাথরে শোভিত। প্রায় সময়ই বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায় এখানে। আহসান মঞ্জিলে দেখার মতো অনেক কিছুই রয়েছে। এর ভেতরে ২৩টি গ্যালারিতে মোট চার হাজার ৭৭টি নিদর্শন রয়েছে।

পরিদর্শনের সময়সূচিঃ কাল ও মাসভেদে আহসান মঞ্জিল পরিদর্শনের সময়সূচি পরিবর্তিত হয়। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর, এই সময়ে শনিবার থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত জাদুঘরে দর্শনার্থী প্রবেশের অনুমতি রয়েছে।

অন্যদিকে, অক্টোবর থেকে মার্চ, এই সময়ে শনিবার থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত জাদুঘরে দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারে। বৃহস্পতিবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনগুলোতে জাদুঘর বন্ধ থাকে।

টিকিটের মূল্যঃ আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের পূর্ব পাশে যে ফটকটি উন্মুক্ত, তার ডান পাশেই রয়েছে টিকিট কাউন্টার। কাউন্টার হিসেবে বর্তমানে যে কক্ষ ব্যবহূত হচ্ছে, আগে সেগুলো সৈনিকদের ব্যারাক ও গার্ডরুম ছিল। যাই হোক, জাদুঘরে প্রবেশের জন্য মূলত সেই কাউন্টার থেকেই টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। টিকিটের মূল্য বাংলাদেশি ১২ বছরের ঊর্ধ্ব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক পর্যন্ত ২০ টাকা এবং ১২ বছরের নিচে বাচ্চাদের জন্য ১০ টাকা। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য টিকিটের মূল্য ৩০০ টাকা হলেও অন্যান্য বিদেশি নাগরিকদের টিকিটের জন্য গুনতে হবে ৫০০ টাকা। হ্যাঁ, প্রতিবন্ধীদের জন্য টিকিটের কোনো প্রয়োজন নেই।

খাবেন কোথায়ঃ খাবারের পদ নিয়ে নতুন করে মনে হয় বলার আর কিছু নেই। কেননা আমরা কম-বেশি সবাই জানি মুখরোচক খাবারের জন্য পুরান ঢাকার সুনাম রয়েছে। তবে ইসলামপুরের জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে কাচ্চি বিরিয়ানি এবং নবাববাড়ির গেট সংলগ্ন অবস্থিত নবাববাড়ির সাঁচি পান অন্যতম।

যাবেন কীভাবেঃ আহসান মঞ্জিলে দুইভাবে যাওয়া যায়। প্রথমত, বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে ঢাকার গুলিস্তান আসতে হবে। সেখান থেকে ত্রি-চক্রযান কিংবা রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি অথবা অটোরিকশা- যে কোনো একটিতে চেপে বসে চলে যান ইসলামপুর। সে ক্ষেত্রে নর্থ সাউথ রোড, নয়াবাজার এবং বাবুবাজার ব্রিজ অতিক্রম করতে হবে। সেখানে পৌঁছানোর পর যে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দেবে জাদুঘর প্রাসাদটির রাস্তা। এখানে নিজস্ব গাড়ি নিয়ে আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা রাস্তা ছোট ও একাধিক অলিগলি থাকায় রিকশাই ভালোভাবে চলতে পারে না। যদিও-বা নিয়ে আসেন, সে ক্ষেত্রে গুলিস্তানে বেশকিছু জায়গা পাবেন, সেখানে কিছু টাকার বিনিময়ে গাড়ি পার্ক করে রেখে যেতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, সর্বপ্রথম ঢাকার সদরঘাট আসতে হবে। সেখান থেকে ১০ মিনিটের পথ হেঁটে কিংবা স্বল্প খরচে রিকশায় পাড়ি দিয়ে খুব সহজেই যাওয়া যাবে আহসান মঞ্জিল।

image

সহজ এফিলিয়েট

ঘরে বসে সহজ আয়

ফেসবুক চালাতে পারলেই আয় করতে পারবেন

এখনি শুরু করুন